সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সহসায় তথ্য উপাত্ত দিচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন, সিএজি (কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল) অফিস রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আইনের নানা ফাঁক ফোকড় খুঁছেন।
আর ওইসব প্রতিষ্ঠান কৌশলে দুদকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা থেকে বিরত রয়েছে।
জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪-এর ১৯(১)(ঘ) ধারায় পাবলিক রেকর্ড তলব করার ক্ষমতা দুদক কর্মকর্তার রয়েছে। যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং ১০৯ ধারা এবং দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় দুদককে সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য।
২০১৩ সালে সংশোধিত ‘দুদক আইনের প্রাধান্য’ অংশে বলা হয়, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা থাকুক না কেন এই আইনের বিধানাবলী প্রাধান্য পাইবে’।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, ব্যাংক, সিএজি অফিসের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ ও সাক্ষ্য প্রদানে গড়িমসি করছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে কখনো ১৮৯১ সালের ‘ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ও ৬ (১) ধারা, ১৮৯৮ সালের ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউরের ৯৪ (১) ধারা এবং ১৮৭২ সালের ‘পাবলিক ডকুমেন্টস’ অ্যাক্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
১৮৯১ সালের ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ধারায় বলা হয়েছে ‘কেস ইন হুইচ অফিসার অব ব্যাংক নট কম্পেলেবল টু প্রডিউস বুকস’। এ ধারা অনুযায়ী গ্রাহকের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোনো তথ্য ব্যাংক কর্মকর্তা সরবরাহ করতে বাধ্য নয়।
একই আইনের ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ইন্সপেকশন বুকস বাই অর্ডার অব কোর্ট অর জাজ’ (বিচারক বা কোর্টের আদেশে বই পরিদর্শন)। তথ্য-প্রমাণের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আদালত কিংবা বিচারকের লিখিত আদেশ দ্বারা নির্দেশিত আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য-প্রমাণ পেতে পারেন । অর্থাৎ আদালতের পূর্বানুমোদনের বাধ্যকতা রয়েছে।
জানা যায়, ২০১৩ সালে নবম জাতীয় সংসদের ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়ন প্রকল্পে টাইগার আইটি (বিডি) নামক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানে নামে দুদক।
দুদকের উপপরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত চেয়ে চিঠি পাঠায়। এর পর অনেক চেষ্টা করেও তথ্য পায়নি দুদক।
গত ৩ মার্চ ইসির উপসচিব মো. সাজাহান খান পাল্টা চিঠিতে দুদকে জানায়, নির্বাচন কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে সংবিধানের ভাবমূর্তি জড়িত। যারফলে তথ্য দেয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া পেট্রো বাংলার অধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২২১ কোটি টাকার দুর্নীতি অনুসন্ধানে ২৫ অডিটরকে গত বছরের ১২ মে তলব করে দুদক। উপপরিচালক শেখ ফাইয়াজ আলম স্বাক্ষরিত তলবি নোটিশে ওই বছর ১৮ ও ১৯ মে অডিটরদের দুদকে হাজির হতে বলা হয়।
গত ২৪ আগস্ট সিএজির পক্ষে ডেপুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল পাল্টা চিঠি দিয়ে বলেন, অডিটররা দুদকে হাজির হলে তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার আশংকা রয়েছে।
ডেপুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল ড. শ্যামল কান্তি চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ২০০৯ সালের ১৮ আগস্ট দুদক চেয়ারম্যান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিএজিসহ অডিট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে একাটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সিএজি কর্মকর্তারা দুদকে হাজির হতে বাধ্য নন- এমন মন্তব্য করে ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, দুদকের তদন্তে সহায়তা প্রদানে সরকারের অধীনস্থ কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সশরীরে সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি দুদক আইন-২০০৪ ও দুদক আইন (সংশোধনী)-২০১৩ কিংবা কোনো বিধিতেও উল্লেখ নেই। ওই চিঠির পর অডিটররা শেষ পর্যন্ত দুদকে হাজির হননি।
তাদের সাক্ষ্যের অভাবে এখনও সম্পন্ন হয়নি পেট্রোবাংলার ২২১ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান।
তথ্য না দেয়া প্রসঙ্গে ড. শ্যামল কান্তি চৌধুরী বলেন, দুদককে তো রেকর্ডপত্র দিচ্ছি। কিন্তু তলব করলে অডিট কর্মকর্তারা (আমরা) যেতে পারব না।
সাক্ষ্য দিতে হলে অডিটররা অডিট করবেন কিভাবে? ভীতি কাজ করবে। অডিটকে কেন সাংবিধানিক রাখা হয়েছে ? যাতে ইনফ্লুয়েঞ্জ করতে না পারে। সারা বিশ্বে অডিটকে সাংবিধানিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের সরকার দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের মামলার তদন্ত শুরু করে দুদক। তদন্তের এক র্পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি সরকারি ব্যাংকের কাছে বদির আর্থিক লেনদেনসহ কিছু রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়।
২০০৯ সালের ২৩ জুন জারিকৃত দুদকেরই একটি অফিস সার্কুলার। ওই সার্কুলারে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে রেকর্ডপত্র সরবরাহ না করার অনুরোধ জানানো হয়।
দুদকের তৎকালীন সচিব খোন্দকার আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশটিতে বলা হয়, ১৮৯১ সালের ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ও ৬ (১) ধারা এবং ১৮৯৮ সালের কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ৯৪ (১) ধারা এবং পেনাল কোড বা দণ্ডবিধির ৪০৩, ৪০৬, ৪০৮ এবং ৪০৯, ৪২০, ৪২৪ ধারায় সংঘটিত অপরাধের অনুসন্ধানে দলিলাদি সরবরাহে আদালতের পূর্বানুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সাংবাদিকেদের বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নিজেদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দাবি করে হয়তো দুদকের কার্যক্রমকে বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সহযোগিতা করতে তারা বাধ্য।
একে





