বর্তমানে দেশের কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের কার্যক্রম চলছে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিসহ নানা ধরণের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে।
আর এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে স্বয়ং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ।
তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের এ শিক্ষা কর্যক্রমে চলছে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা।
এ বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তার আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের পরিমাণ যথারিতী শীর্ষে অবস্থান করছে। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, এ যাবত নিয়ম কানুন না মেনে নিজস্ব লোক দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকার কাজ করেছে। এছাড়া তার বাসার যাবতীয় কাজ এসি থেকে বেসিন পর্যন্ত সবই ক্রয় করেছে বোর্ডের টাকায়।
বিভাগীয় প্রধানের পরামার্শ না করেই নিজস্ব লোক দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকার টিভি বিজ্ঞাপন করাসহ এক লক্ষ টাকা দিয়ে নিজস্ব লোক দিয়ে ‘অনার বোর্ড’ তৈরি করেন যা ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় করা সম্ভব বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে লক্ষাধিক টাকা গ্রহণ, মোবাইল ও ল্যাপটপ থাকা সত্বেও আশি হাজার টাকার দুটি মোবাইল এবং দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে আর একটি ল্যাপটপ ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া তার চেয়ারম্যান পদে আরোহন করানোর অন্যতম সহযোগী সাইক গ্রুপ ইন্সটিটিউটের মালিক আবু হাসনাত মো. ইয়াহিয়া ও তার স্ত্রী সোহেলী ইয়াসমিন। তারা প্রকাশ্যে দাবি করছেন ত্রিশ লক্ষ টাকা বং করে মোস্তফিজুর রহমানকে আমরা কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আরোহন করিয়েছি।
এই সুবাদেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই তারা তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের টেকনোলজি ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করাসহ নতুন প্রতিষ্ঠান অন্যদের করে দেয়ার দালালী করছেন।
জানাযায়, বিগত প্রশাসন আশি শতাংশ দুর্নীতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও এখন চিত্রটা এক বারেই ভিন্ন। এখন প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়া অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যার ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে, কেউ কাউকে মানছে না।
অভিযোগ রয়েছে তিনি নিজে যেহেতু জামায়াত পন্থি সেহেতু বিভিন্ন প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে জামায়াত এবং বিএনপি পন্থি একটি কর্মচারি ইউনিয়ন গঠন করেছেন। এই কৌশলে জামায়াত-বিএনপি পন্থিদের বোর্ডেও নিয়ে আসছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ইউনিয়নের লোক দিয়ে হুমকি ধামকি দিয়ে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করাসহ হয়রানিমূলক বদলি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তার মদদেই সৎ ও নিবেদিত কর্মি মুক্তিযোদ্ধা সচিবকে বোর্ড থেকে তাড়ানোর জন্য তার বিরুদ্ধে দস্তখত সংগ্রহ করেছেন। যারা ওই দস্তখত করেননি তাদরেকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। যারফলে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যা যেকোন সময় বিরুপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে।
এছাড়া সৎ ও নিবেদিত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বাদ দিয়ে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ইউনিয়ন ও সাইক গ্রুপের পরামর্শে বোর্ড পরিচালনা করছেন। নিজের লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্যে বাছাই করা এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে থাকা সাতজন কর্মকর্তাকে তার নির্দেশে বাদ দেয়া হয়েছে।
ঢাকায় তার কয়েকটি বাসা রয়েছে। যা শুধুমাত্র এই চাকরির টাকাতে অসম্ভব। তার মধ্যে ঢাকার তেজগাঁওয়ের প্রত্যাশা টাওয়ারে দুটি ফ্লাট, আমিন বাজার এবং গাজীপুরে জমি ও বাড়ি অন্যতম।
এর আগে গত ১২ জুন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবর এক চিঠিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ এবং কারিগরি অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক বর্তমান বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ ও সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে তদন্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়।
ওই চিঠিতে বলা হয়, তিনি রাজশাহী পলিটেকনিকে অধ্যক্ষ থাকাকালীন অর্থ-আত্মসাৎ, ভোকেশনালের পরিচালক থাকাকালীন শিক্ষকদের বদলির হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়, কারিগরি অধিদপ্তরের ভবন নির্মাণে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ-আত্মসাৎ করেছেন।
মোস্তাফিজুর রহমানের ওই পদে থেকে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে দুই বিঘা জমি, ঢাকার তেজগাঁওয়ে দুটি ফ্ল্যাট, এয়ারপোর্টে ও রাজউকে পৃথক দুট প্লট, পরিবারের জন্য দুটি টয়োটা গাড়ির ব্যবহার অসম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তার আপন দুই বোন, বোনের স্বামী, খালাতো বোন, খালাতো বোনের স্বামী, শ্যালকসহ নিকট আত্মীয়ের অনেককেই কারিগরি অধিদপ্তরে চাকরি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
তিনি ভোকেশনালে পরিচালক থাকাকালীন তার অধীনে বিভিন্ন টি.এস.সি থেকে নিয়মিত অর্থ নিতেন। না দিলে অধ্যক্ষকে হয়রানি করা হতো। টি.এস.সি’র প্রতিটি শিক্ষক কর্মচারী বদলীর জন্য ৫০ হাজার টাকা নিতেন।
আগারগাঁওয়ে কারিগরি অধিদপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকপ্লে ত্রুটিপূর্ণ ভবনটি নির্মাণে ঠিকাদারের সাথে যোগসাজসে নিম্নমানের মালামালসহ নির্মাণ অসম্পূর্ণ রেখে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা অত্মসাৎ করে নিজ বাসার প্রতিটি রুমে এসি ও দামী আসবাবপত্রে সজ্জিত করিয়ে নেন।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পিআইইউ) আ.ন.ম সালাউদ্দিন খানের সাথে যৌথভাবে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। ২০০১ সালে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এবং জামায়াতের সাথে সংস্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে দিনাজপুর পলিটেকনিকে বদলী করা হয়। কেবল অনিয়ম ও দুর্নীতি নয়, এর মাধ্যমে সম্পদের বিবরণও দেয়া হয় ওই চিঠিতে।
অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, গাজীপুরের বোর্ড বাজারে দুই বিঘা জমি, ঢাকার তেজগাঁওয়ে দুটি ফ্ল্যাট, এয়ারপোর্টে ও রাজউকে পৃথক দুট প্লট, পরিবারের জন্য দুটি টয়োটা গাড়ি ব্যবহার।
এছাড়া তার ছেলের ব্যাংক হিসেবে নিজস্ব আয় বহির্ভূত অতিরিক্ত ২৬ লাখ ১২ হাজার ৮৯১ টাকা জমা হওয়ার কর সার্কেল-২৯৮, কর অঞ্চল-১৪ ঢাকা অফিস গত ১৭ জুন ২০১২ সালে এই টাকা জমা হওয়ার উৎস সম্পর্কে পত্র জারি করে।
২০১২ সালে এই ছেলের বিয়েতে ১০০ ভরি সোর গহনা দিয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়। মোস্তাফিজুর রহমান অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি ছাড়াও তার স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নিকট রেখেছেন।
বর্তমানে তিনি ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এবং ওই পদে থেকে কিভাবে এতো সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব তাও প্রশ্ন তুলেছেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
এমনকি মোস্তাফিজুর রহমানের ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। তিনি ২০০৯ সালে অমেরিকান ওয়াল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ওই ডিগ্রি নিয়েছেন।
নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে তার আপন দুই বোন, বোনের স্বামী, খালাত বোন, খালাত বোনের স্বামী, শ্যালকসহ নিকট আত্মীয়ের অনেকেই কারিগরি অধিদপ্তরের চাকরি দিয়েছেন।
এর আগে মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির তদন্তসহ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ২০১১ সালের ২১ মে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেন তৎকালিন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভাপতি আহম্মদ হোসেন।
২০১১ সালের ১৫ মে মাদারীপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সহকারি সুপারিনটেনডেন্ট (অব.) মো. আরশাদ আলী খান মোস্তাফিজুর রহমানের বিরদ্ধে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক থাকাকালীন সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি দেন।
মোস্তফিজুর রহমান ৭ জুলাই, ১৯৯৪ সালে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চিফ ইনস্ট্রাকটর পদে যোগদান করেন। সেখান থেকে তদবিরের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক পদে পোস্টিং নেন। সহকারী পরিচালক পদে চাকরিরত অবস্থায় উপাধ্যক্ষ পদে মন্ত্রণালয়ের ডিপার্টমেন্টাল প্রোমশন কমিটি (ডিপিসি) এর মাধ্যমে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল রয়েছেন।
এসএইচ





