রাজধানীর ইডেন কলেজের অনার্স শেষবর্ষের ছাত্রী ফারজানা আক্তার (ছদ্মনাম)। তার বাসা রাজধানীর কদমতলীর মুজাহিদনগর এলাকায়। পরিবারে সবার ছোট তিনি।
সম্প্রতি তার বাবা হৃদরাগে আক্রান্ত হওয়ায় দ্রুত তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে উদগ্রীব হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। এলাকার বিশ্বিবিদ্যালয়ছাত্র তানভীর রহমানের (২৪) সঙ্গে পাঁচ বছর ধরে প্রেম চলছিল ফারজানার।
এ বিষয়টি জানতেন না তার বাবা। পারিবারিকভাবে বিয়ের তোড়জোড় দেখে তানভীরকে বিয়ের জন্য চাপ দেন ফারজানা। কিন্তু বিয়ে করতে রাজি হননি তানভীর।
তাই পরিবারের চাপে গত অক্টোবরে বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন ফারজানা। বিয়ে হলেও শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া হয়নি তার।
আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কিছু দিনের মধ্যেই স্বামীর বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল তার। এরই মধ্যে স্বামীর সঙ্গে ঘুরেফিরে আর গল্প-গুজব করে মহানন্দেই দিন কাটছিল ফারজানার।
২৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় স্বামীর মোবাইল থেকে ফোন আসে ফারজানার মোবাইলে। অন্যান্য সময়ের মতো খুবই আগ্রহ নিয়ে ফোনটি ধরেন ফারজানা। কিন্তু এর পরই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
রাজ্যের অন্ধকার গ্রাস করে তাকে। মাথাটা ঝিম হয়ে আসে। পা দুটো অবশ হয়ে পড়ে। মনে হচ্ছিল, জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবেন তিনি। দুই চোখ গড়িয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু। কাউকে কিছুই বলতে পারছিলেন না।
কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তার মনে হচ্ছিল, ওই ফোনটি আসার চেয়ে মৃত্যুও ভালো ছিল। স্বামী তাকে ফোন করে বলেছিলেন- ‘আমার ফেসবুক ইনবক্সটা চেক করো।
তোমার প্রেমিক সেখানে কিছু ছবি পাঠিয়েছে। যেগুলো আমার পক্ষে আর দ্বিতীয়বার দেখা সম্ভব নয়।’ ঘটনার আকস্মিকতার রেশ কাটতে না কাটতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে আসতে থাকে একের পর এক ফোন।
কারণ তানভীর কেবল ফারজানার স্বামীর ইনবক্সেই আপত্তিকর অশ্লীল ছবিগুলো পাঠায়নি। নিজের বাবার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি (একজন মেয়ের নামে) খুলে তানভীর সেই ছবিগুলো পাঠিয়েছে ফারজানার ভাসুর, ননদসহ অন্য আত্মীয়দের ফেসবুক ইনবক্সেও।
২০১১ সাল থেকে চলা তানভীরের সঙ্গে ফারজানার প্রেমের বিভিন্ন সময়ের অন্তরঙ্গ ছবি ছিল সেগুলো। একপর্যায়ে ফারজানাকে তালাক দেয়ার উদ্যোগ নেন তার ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামী।
উপায় না দেখে ফারজানা ফোন করেন তানভীরকে। তার কাছে জানতে চান, সে ওই ছবিগুলো ইনবক্স করেছে কিনা। ছবি পাঠানোর কথা স্বীকার করে তানভীর জানান, তার কাছে আরও ছবি আছে।
সেগুলোও তিনি পর্যায়ক্রমে পাঠাবেন। দিয়ে দেবেন ফেসবুক ওয়ালে। ছড়িয়ে দেবেন ইন্টারনেটে। নষ্ট করবেন তার সংসার। ফারজানা থানা পুলিশের সাহায্য চাইতে বাধ্য হন।
পুলিশ তাকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলার পরামর্শ দেয়। ৩১ ডিসেম্বর মামলার পরদিনই পুলিশ তানভীরকে গ্রেফতার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তানভীর ঘটনার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
এখন তানভীর জেলহাজতে। থানা পুলিশ উভয় পরিবারকে ডেকে বিষয়টি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। পুলিশের পক্ষ থেকে ফারজানার স্বামীর বাড়ির লোকদের বলা হয়, আজকাল কাট-পেস্ট ও ফটোশপের মাধ্যমে অনেক ছবি তৈরি করা যায়।
এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করবেন না। যে ছেলেটি নোংরা কাজ করেছে তার যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এরপরও বিষয়টিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না ফারজানার শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে এখনও চলছে টানাপড়েন। জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ের পর থেকেই এক অজানা আতংকে দিন কাটছিল ফারজানার।
আপত্তিকর ছবিগুলো ফেরত চেয়ে তানভীরের কাছে বারবার আকুতি জানিয়েছিলেন ফারজানা। বলেছিলেন, ‘আমি তো তোমাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তুমি বিয়ে করলে না। তাই পরিবারের চাপে অন্যত্র বিয়ে করলাম।
আমার কোনো দোষ ছিল না। আমার কোনো ক্ষতি করো না।’ কিন্তু মেয়েটির কোনো আকুতিই মন গলাতে পারেনি তানভীরের। ওসি জানান, মামলাটির তদন্ত শেষপর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এসআই প্রদীপ কুমার কুণ্ডু। আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
মাহমুদ





