পবিত্র ঈদুল আযহা ও দূর্গা পূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অজ্ঞানপার্টি। গত এক মাসে রাজধানীতে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ার ঘটনা ঘটেছে ৫৪টি। আর এসব ঘটনায় অসুস্থ হয়েছেন অন্তত চার শতাধিক। গত সাত দিনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন অজ্ঞানপার্টির মোট ২৭ জন সদস্য।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে গত এক মাসে জ্ঞান হারিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন কমপক্ষে ৩৯৫ জন। এদের মধ্যে গেলো সপ্তাহে দুজন প্রাণও হারিয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা ও শারদীয় দূর্গা পূজা উপলক্ষ্যে রাজধানী জুড়ে উল্লেখজনক হারে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা। আর অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ।
কোথাও পান বিক্রেতা, কোথাও সিগারেট বিক্রেতা কিংবা লেগুনা বাস ও ট্রেনে যাত্রীবেশে উঠে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা তাদের এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে। নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।
বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, ঈদুল আযহা ও শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরুর আগে থেকেই আশঙ্কাজনক হারে রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টিগুলোর দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এ দুটি উৎসবে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তারা। শারদীয় পূজা শুরু হয়েছে। ঈদও আসন্ন। এ সময়ে মানুষের নগদ টাকার লেনদেন বেশ কয়েকদিন চলবে। এই সময় রাস্তায় কেউ অজ্ঞান পার্টির কবলে না পড়ে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সে ব্যাপারে বিশেষভাবে তৎপর থাকা উচিত।
পুলিশের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য নতুন নয়। পুলিশের তৎপরতায় এদের দৌরাত্ম্য কমে, আবার পুলিশের তৎপরতা কমে গেলে এদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।
সম্প্রতি ঈদ ও পূজাকে এক প্রকার মৌসুম মনে করেই অজ্ঞানপার্টি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে রাজধানী জুড়ে তাদের অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এসব ঘটনায় পুলিশের হাতে অজ্ঞানপার্টির ২৭ সদস্য ধরা পড়েছে বলে ডিএমপি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, রাজধানী জুড়ে অজ্ঞানপার্টির কমপক্ষে ৩৫ টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি চক্রে ১২ থেকে ১৫ জন সদস্য। এলাকা ভাগ করে একেকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবার অপতৎপরতা শুরু করে। তবে সম্প্রতি পুলিশী তৎপরতায় অজ্ঞানপার্টির ২৭ সদস্য গ্রেফতার হওয়ার ফলে অন্য সদস্যরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।
ঘটনা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর গুলশান-১ এলাকা থেকে খোকন (৪০) নামে এক সিএনজি চালককে চেতনানাশক ঔষধ খাইয়ে সিএনজি ও নগদ টাকাসহ পালিয়ে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে তিনি সেখানে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ার কথা জানান।
একই দিন রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে সুমন(২২) নামে পাবনা টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের একটি ল্যাপটপ, মোবাইল সেট ও নগদ টাকা খোয়া যায়। পরে তিনি ঢাকা মিডফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন।
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর গোলাপবাগে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে মারা যান কলেজছাত্র মো.সোহাগ (১৯)। ২৪ সেপ্টেম্বর মারা যান ঢাকা-চট্টগ্রাম ‘পথের মেইল’ ট্রেনের চালক সোলেমান খান (৫০)।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ২৪ সেপ্টেম্বর মোট ৯ জন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। তারা হলেন, গুলিস্তানের কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ইব্রাহিম, বাসযাত্রী সাইফুল, যাত্রাবাড়ীতে আবদুর রহিম। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে মনির হোসেন, আবুল কাশেম, নজরুল ইসলাম, খোরশেদ আলম, কালাম ও আলমগীর হোসেন চিকিৎসা নেন।
পরের দিন ফুলবাড়িয়ায় পলাশ আহমেদ, রায়েরবাগের শাহাবুদ্দীন, কারওয়ান বাজারে কামরুল ইসলাম এবং মুগদাপাড়ার আবদুল্লাহ আল ফাহিম অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
৩০ তারিখে মিরপুরের পানির ট্যাংকির সামনে এক মহিলাকে অজ্ঞান করে নগদ টাকা, ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা। এর আগেরদিন আজিমপুরের রসুলবাগের সিএনজি চালক আবুল শেখ (৪০)কে আজিমপুর বটতলা এলাকায়ে আটকে অজ্ঞান করে অটোরিকশা নিয়ে চলে যায় অজ্ঞানপার্টি।
ভুক্তভোগীদের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, ঘটনা ঘটার আগে পুলিশের কোনো তৎপরতা থাকে না। এমনকি মামলার পরেও জড়িত কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে না।
এব্যাপারে গুলশান-১ এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়া খোকন(৪০) টাইমনিউজবিডিকে বলেন, গুলশান থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বলছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার অভিযোগ, পুলিশ আগে থেকে অভিযান না চালানোর কারণে দৌরাত্মের মুখে পড়তে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তৎপরতা বেশি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাস স্টপেজ ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, কাকরাইল, মালিবাগ, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন জাগায় ছদ্মবেশী অজ্ঞান পার্টি সদস্যদের বিচরণ।
অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা কখনো ডাব বিক্রেতা, কখনো ভ্রাম্যমান পান সিগারেটের দোকান, কখনো হকার সেজে এই কাজ করে।
সায়েদাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী মনসুর জানান, এই এলাকায় পান সিগারেট বিক্রেতার আড়ালে মূলত: অজ্ঞানপার্টির তৎপরতা চলে। টার্গেট করে কেমিক্যাল দেয়া পান-সিগারেটে বিক্রির করে। এরপর পিছু নেয়। অজ্ঞান হয়ে পড়লে দ্রুত সর্বস্ব লুট করে কেটে পড়ে পার্টির সদস্যরা।
ঢাকা ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক বিল্লাল হোসেন জানান, অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের অধিকাংশকে উচ্চমাত্রার ‘ডায়াজিপিন’ ট্যাবলেট খাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব ওষুধ ডায়াবেটিস ও লিভারে সমস্যাগ্রস্ত রোগীদের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ‘লারগেটিল’ জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে।
ডিবির সূত্র জানায়, রাজধানীতে ডিবির চার বিভাগে চারজন অতিরিক্ত উপকমিশনারের তত্ত্বাবধানে গঠন হওয়া চারটি দল অজ্ঞানপার্টির তৎপরতা বন্ধে অভিযান চালাচ্ছে।
এব্যাপারে গোয়েন্দা পুলিশের(ডিবি) সহকারী কমিশনার মো.মাহমুদ নাছের জনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, উচ্চক্ষমতার ঘুমের বড়ি পানিতে গুলিয়ে চা, শরবত, ডাবের পানি, ভাত, জুসের প্যাকেট, শসা, কোমলপানীয়, পান, ঝালমুড়ি, ক্রিম দেওয়া বিস্কুটে মিশিয়ে কৌশলে মানুষকে খাইয়ে অজ্ঞান করে সব লুটে নেয়।
তিনি আরও জানান, রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় অজ্ঞানপার্টির কমপক্ষে ৩৫টি চক্র সক্রিয়। ঈদ ও দুর্গাপূজা সামনে রেখে চক্রগুলো বেপরোয়া তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে ঈদ ও পূজা উপলক্ষে ঢাকার চার ডিভিশনের ডিসিদের নের্তৃত্বে অজ্ঞানপার্টি, জাল টাকা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বন্ধে একযোগে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বিভিন্নচক্রের ২৭ সদস্য গ্রেফতারের ফলে অন্য সদস্যরা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ঈদ ও পূজাকে অজ্ঞানপার্টি মৌসুম হিসেবে নিয়ে তাদের অপতৎপরতা চালাচ্ছে। অজ্ঞানপার্টির অপতৎপরতা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ডিএমপি’র ৪ ডিভিশনকেই একযোগে কাজ করতে বলা হয়েছে।
অজ্ঞানপার্টিসহ প্রতারক চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েছে। অজ্ঞানপার্টির হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে সতর্ক থাকার এবং ভাসমান দোকান ও ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে কিছু কিনে না খাওয়ার জন্য আহ্বান জানান কমিশনার বেনজীর আহমেদ।
জেইউ/জেডআই





