‘সৌন্দর্য্য’ কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি লাবন্যময় হাসিমাখা মুখের প্রতিচ্ছবি। সুন্দর হতে চায় না এমন মানুষ এই গ্রহে আছে বলে মনে হয় না। আর আপনি যদি সেই সৌন্দর্য্যের খোঁজ করেন, তাহলে বিষয়টি হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত।
কিন্তু হাতের নাগালে পাওয়া যে সব প্রসাধনী আমরা ব্যবহার করছি তার কত টুকুইবা উপকার করছে, আর নাকি ক্ষতির পরিমাণই বা বেশি করছে। আপনার অজান্তেই আপনার রুপচর্চার সাথী হচ্ছে রুপঘাতি সব পণ্য সামগ্রী।
ভেজাল পণ্য পাইকারি ভাবে বাজারজাত হয় দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চকবাজার থেকে। যে জায়গা থেকে সারা দেশে প্রসাধনি সামগ্রী বাজারজাত করা হয়। প্রতিবেদক একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দন্ধু সুলভ ভাবে জানতে পারলেন, যেখানে ঐ ব্যবসায়ী বলছিলেন, ভেজাল পণ্য বাজারজাত করনের জন্য সব কন্টেইনারগুলো তারা চীন থেকে আমদানী করে।
পণ্য গুলো তৈরী হয় মূলত চকবাজার, ইসলামপুর, জিঞ্জিরা সহ ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় অবস্থিত অবৈধ কারখানায়। এক কারখানায় সম্পূর্ণ পণ্যটি নিরাপত্তার বিবেচনায় এক জায়গায় তৈরি হয়না। তিন জায়গায় তিনভাবে কাজটি সমপন্ন হয়। চুড়ান্ত পেকেটজাত কাজটি সমপন্ন করা হয় চকবাজারে।
আর এসব ভেজাল পণ্য তারা বাজারজাত করে প্রকৃত পণ্যের অর্ধেক দামে। যেখান তার উল্লেখিত তালিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নামী-দামি কোম্পানীগুলোর পণ্যের নামই শোনা গেল, পারফিউম থেকে শুরু করে প্রসাধনীর এমন কোন পণ্য নেই যেটি নকল হচ্ছে না।
সারা বছর চাহিদা কম থাকলেও ঈদ আসলেই ললনাদের কেনাকাটার তালিকার প্রথমদিকেই থাকে মেহেদির।
এসব বিভিন্ন নামের মেহেদি প্রশাসনের দৃষ্টির অগোচরে ক্ষতিকারক এসিড দিয়ে অবাধেই তৈরি হচ্ছে । প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির পাশাপাশি নকল মেহেদি তৈরিতেও ধুম লেগেছে কারখানাগুলোতে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, কোন প্রাকৃতিক মেহেদি নয়, ক্ষতিকারক এসিড ও নানা রং মিশিয়ে বানানো হচ্ছে এসব নামি মেহেদি।
বিবিসির এক তথ্য মতে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ প্রসাধনী সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে তার ১৫% আসে বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে, ১৫% আসে দেশিয় প্রসাধনি সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে। আর বাকী ৭০% প্রসাধনীই অবৈধভাবে বিভিন্ন গোপন কারখানায় তৈরী করা হয়।
ব্যবসায়ী মান্নান বললেন, তারা যেসব উপাদান দিয়ে এসব প্রসাধনী তৈরী করে সেগুলো কোন রকম কাজ করেনা, মানে ভালো ও করেনা আবার মন্দও করেনা।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চর্ম রোগ বিশেজ্ঞ অধ্যাপক এম এন হুদার কাছে জানতে চাইলে তিনি তুলে ধরলেন এসব ভেজাল পণ্য ব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে।
তিনি বললেন যে, এসব ভেজাল পণ্য ব্যবহারের কারণে মানুষের অকালে চুল পরে যাওয়া, অল্পবয়সে বার্ধক্য চলে আসা, চামড়ায় ক্যান্সারের মত বড় ব্যাধি হওয়া সহ শরীরের অভ্যন্তরে ফুঁসফুঁস, হৃদপিন্ড, কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি অনেকেই মারাত্মক এলার্জেটিক রোগে আক্রন্ত হন যার ফলে অকালে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলেও পড়ছেন পারেন।
আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী যদি এমন মারাত্মকভাবে ভেজালে ভরা থাকে সেটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে হুমকিস্বরূপ।আর যেহেতু পণ্যের কন্টেইনারগুলো বাইরে থেকে আসে, সেই সাথে এগুলোকে অভিজাত বিপণী বিতানেও বাজারজাত করা হয়। যার দ্বারা সকল শ্রেনীর ক্রেতাদেরই কম বেশী এসব ভেজাল পণ্যের স্বীকার হতে হচ্ছে বলে মনে করছি।
আর তাছাড়া বিদেশ থেকে আমদানীকৃত প্রসাধনীর মূল্য সাধারণ ক্রেতাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় এক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি। কারণ, মোট চাহিদার ৭০% ই ভেজাল পণ্য আর সেগুলো সাধারণ বিপণী বিতান সহ দেশের জেলা শহর সহ গ্রাম পর্যায়ের বিপণী বিতানেই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। আর জেনে হোক আর না জেনে হোক একটা বিশাল জনগোষ্ঠী মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
যার প্রতিকার এখনই করতে হবে।একজন ক্রেতা তার চাহিদা মেটানোর জন্য সবসময় মান বিচারের দিকে মনোযোগী না ও হতে পারে। কারণ, সে প্রথমত তার সামর্থ্য দেখবে। সব ক্রেতারই সামর্থ্য নেই বিদেশী প্রসাধনী ব্যবহার করার। আর অনেক সময় সামর্থ্য থাকলেও সে হয়তো তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্যটি পাচ্ছেই না, আর সেক্ষেত্রে তখন হাতের নাগালে পাওয়া পণ্যটিই কিনতে বাধ্য হয়।
ভুক্তভোগিরা মনে করছেন, জড়িতদের কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির বিধান করতে হবে। আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে আর সেই সাথে আইনের সঠিক বাস্তবায়নও খুব বেশি জরুরী। আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায়, অপরাধীকে কঠিন শাস্তি না দেওয়ায় কখনো কখনো লঘু শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়াতে এসব অবৈধ কাজ আরো বেড়েই চলেছে।
আর যেসব কন্টেইনার বিদেশ থেকে আমদানী করা হচ্ছে এসব ভেজাল প্রসাধনী বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে, সেসব কন্টেইনার আমদানীতে কঠোর নীতিমালা তৈরী করা প্রয়োজন। আর পাশাপাশি বিদেশী পণ্যের আমদানির উপর শুল্কহার কমিয়ে দেয়া গেলেও হয়তো ক্রেতাদের কিছুটা সুবিধা হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়িরা।
এমএ





