জামিন পাওয়ার পরও অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের (এওআর) পক্ষ থেকে ‘ল-ইয়ার সার্টিফিকেট’ পাঠিয়ে কারামুক্তি আটকে রাখায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, শুধু এ তিন আসামিই নয়, ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়ে প্রতিনিয়তই আসামিদের কারামুক্তি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে- এ ধরনের অভিযোগ পাচ্ছি।

আপিল বিভাগ জামিন স্থগিত করতেই পারেন। কিন্তু এর আগে কিভাবে একজন আসামির কারামুক্তি বাধাগ্রস্ত করা যায়।

এ সময় আদালত এওআরকে বলেন, আপনারা হাইকোর্টের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আপনারা আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের মাঝখানে কি আরেকটি বিভাগ তৈরি করছেন?

জামিননামা দাখিলের পরও দীর্ঘদিন তিন আসামির কারামুক্তি আটকে রাখার ঘটনায় করা এক আবেদনের শুনানিকালে হাইকোর্টের বিচারপতি ফরিদ আহম্মদ ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এসব মন্তব্য করেন।

অভিযোগ উঠেছে, সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস অথবা এওআর ফোন করে, ফ্যাক্স পাঠিয়ে অথবা সার্টিফিকেট ইস্যু করে আসামিদের কারামুক্তি আটকে দেন। আপিল করা হবে জানিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে আটকে রাখতে বলা হয়। এ ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এমনই শিকার গিয়াস উদ্দিন, আমিনুর রহমান ও ওসমান গনি। অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলায় ২ জানুয়ারি রামপুরা থানায় মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে।

এ মামলায় ৮ মে ৫ আসামি জামিন পান হাইকোর্ট থেকে। ১৬ মে কেন্দ্রীয় কারাগার ও ১৭ মে কাশিমপুর কারাগারে জামিননামা দাখিল হয়। এরপর দুই আসামিকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু তিন আসামি গিয়াস উদ্দিন, আমিনুর রহমান ও ওসমান গনিকে মুক্তি দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। জামিননামা যাওয়ার পরও কারামুক্তি না পাওয়ায় তারা হাইকোর্টে আবেদন করেন।

৫ জুন এ আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির, কাশিমপুর কারাগার-১-এর জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা ও এওআর সুফিয়া খাতুনকে তলব করেন হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী বৃহস্পতিবার তারা হাজির হন।

আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আমরা ১৬ মে জামিননামা পাওয়ার পর তা কাশিমপুর কারাগারের উদ্দেশে পাঠিয়ে দিই।

সুব্রত কুমার বালা বলেন, ১৭ তারিখে জামিননামা পেয়েছি। কিন্তু জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে মর্মে একটি চিঠি আসে। ফলে তাদের মুক্তি দেয়া হয়নি।

এ পর্যায়ে সুফিয়া খাতুন বলেন, হাইকোর্টের জামিন আদেশ ৭ জুন আপিল বিভাগ স্থগিত করেছে। আদালত বলেন, আপিল বিভাগ তো অনেক পরে জামিন স্থগিত করেছেন। কিন্তু জামিননামা তো দাখিল হয়েছে ১৬ মে।

আপনি কেন কারাগারে ফ্যাক্স কপি পাঠালেন? আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের মাঝখানে কি আরেকটি বিভাগ তৈরি করছেন? সুফিয়া খাতুন বলেন, রাষ্ট্র আমার মক্কেল। মক্কেলের জন্য আমি উকিল সার্টিফিকেট দিতে পারি। আর আমি ফ্যাক্স পাঠাইনি।

আমি শুধু লিখিত দিয়েছি যে আপিল করা হবে। ফ্যাক্স অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে গেছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে এই মর্মে আপনারা একের পর এক ফ্যাক্স কারাগারে পাঠাচ্ছেন।

আপনারা তো হাইকোর্টের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। জামিননামা দাখিলের পরও মুক্তি না দিয়ে আসামি আটকে রাখার জন্য আপনাদের শাস্তি দেয়া যেতে পারে।

এরপর আদালত জামিননামা দাখিলের পরও কোন কর্তৃত্ববলে তিন আসামিকে মুক্তি না দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে তার ব্যাখ্যা তলব করেন।

৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির, কাশিমপুর কারাগার-১ এর জেল সুপার সুব্রত কুমার বালাকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিতের আবেদন জানানো হবে মর্মে কোন কর্তৃত্ববলে ‘ল-ইয়ার সার্টিফিকেট’ কারাগারে পাঠানো হয়েছে সেই বিষয়ে এওআর সুফিয়া খাতুনকে ব্যাখ্যা দিতে বলেন আদালত।

শুনানিকালে তিন আসামির পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী রুহুল আমিন ভুঁইয়া ও আদিলুর রহমান খান শুভ্র এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম।

পরে রুহুল আমিন ভুঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল (সিএমপি, সিপি) ফাইল না করেই তারা কারাগারে ‘ল-ইয়ার সার্টিফিকেট’ পাঠিয়ে আসামিদের কারামুক্তি আটকে রাখেন। আপিল করবে উল্লেখ করে সার্টিফিকেট পাঠান। পরে আপিলও হয় না বা অনেক দেরিতে হয়। এভাবে হয়রানি করেন।

রুহুল আমিন আরও বলেন, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আবেদন ফাইল করার পর আপিল বিভাগ থেকে স্থগিতাদেশ পেলে কেবল ‘ল-ইয়ার সার্টিফিকেট’ পাঠাতে পারেন।

তারা সার্টিফিকেট পাঠিয়ে বলতে পারেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হয়েছে, আসামি যেন বের না হয়। কিন্তু এওআর যেভাবে পাঠান সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ।

এভাবে ফোন ও সার্টিফিকেট কপি পাঠিয়ে প্রায় সময়ই কারামুক্তি আটকে রাখায় আদালত খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আদালত বলেছেন, আপনারা এটা পারেন না।

রুহুল আমিন আরও বলেন, জেল কর্তৃপক্ষ বলেছে প্রথমে আমরা এওআরের কাছ থেকে আইনজীবী সার্টিফিকেটের ফ্যাক্স পাই।

পরে এওআর টেলিফোন করে বলেছে আসামিকে ছাড়া যাবে না। অন্যদিকে এওআর বলেছেন, তারা দেখাক আমরা কখন টেলিফোন করেছি।

পরে কোন কর্তৃত্ববলে সার্টিফিকেট ইস্যু করেছেন- এ বিষয়ে আদালত এওআরকে জিজ্ঞেস করেছেন। এসব ব্যাপারে আদালত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত দিতে বলেছেন।

এমআইএস/