মোবাইলফোনে ফ্রেক্সিলোডের মাধ্যমে পরিচয়। এরপর কথা, প্রেম। সপ্তাহ না পেরুতেই বিয়ের প্রস্তাব। এরপর বিয়ের কথা বলে খুলনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে যশোরের বেনাপোল দিয়ে ওপারে পাচারের চেষ্টা। কিন্তু তার আগেই র্যাবের হাতে ধরা পড়ে নারী পাচারকারীরা।
সীমা ও কুলসুমকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে এভাবেই পাচার করতে চেয়েছিল পাচারকারী চক্রের মূল হোতা জোব্বার হোসেন ওরফে মারুফ এবং সাকিব। সীমাকে মারুফ নিজেকে আর্মি অফিসার এবং কুলসুমকে সাকিব পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন।
সীমা ও কুলসুম দুজনই সাভার আশুলিয়ার পুকুরপাড় এলাকায় থাকতেন। সেখানকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন কুলসুম ও সীমা। সীমার গ্রামের বাড়ি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। আর কুলসুমের গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীমা ও কুলসুমকে পাচারের আগে যশোরের বেনাপোল এলাকা থেকে উদ্ধার করে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। এসময় পাচারকারী চক্রের মূলহোতা সাকিবকে গ্রেফতার করে র্যাব-২ এর সদস্যরা।
তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মারুফকে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর পাচারকারী চক্রের অপর দুই সদস্য ডালিম(২৮) ও পল্টুকে গ্রেফতার করা হয়।
মঙ্গলবার বিকালে র্যাব-২ এর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিও লে. কর্ণেল কে এম আজাদ বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে উদ্ধারকৃত দুই নারী সীমা ও কুলসুমকে হাজির করা হয়।
সীমা জানান, ১৫ দিন আগে মোবাইলে কে বা কারা আমার নাম্বারে ৫০ টাকার ফ্লেক্সিলোড দেয়। কিছুক্ষণ পর একটি নাম্বার থেকে আমার মোবাইলফোন নাম্বারে কল আসে। কল রিসিভ করলে মারুফ আমার সাথে কথা বলেন। তিনি আর্মি ক্যাপ্টেন বলে পরিচয় দেন। এরপর আমাদের মধ্যে আলাপচারিতা। এ সুত্র ধরে ভাই বোনের আদলে কথা চলতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা গড়ায় প্রেমের সর্ম্পকে।
অপরদিকে কুলসুমের নাম্বারে ঠিক একইভাবে রং নাম্বার থেকে কল আসে। সে সুবাদে কুলসুমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে পাচারকারি আরেক সদস্য সাকিব।
কুলসুম জানান, সাকিব আমার কাছে নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু আমি ও সীমা একই রুমে বাস করলেও ব্যাপারটা বুঝিনি। দুজনই গোপন রেখেছিলাম। প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনকারি দুজন একে অপরের পূর্ব পরিচিত বলে আমরা পরে জানতে পারি।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, দেখা করার কথা বলে সীমাকে একদিন মারুফ সাভার স্মৃতি সৌধে আসতে বলে। সীমা দেখা করতে আসলে বিয়ের প্রস্তাব দেয় মারুফ।
অপরদিকে কুলসুমও সাকিবের কথায় একই এলাকায় দেখা করতে যায়। দেখা শেষে সাকিব কুলসুমকে যশোর বেনাপোলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে বলে অনুরোধ করে তার সাথে যশোরে যাবার জন্য।
সাভারেই প্রথম তাদের মধ্যে দেখা হয়। একই সময়ে আলাদাভাবে দুজনই যান দেখা করতে। সেখানে নতুন করে সবার সঙ্গে পরিচয় হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে আইডি কার্ড দেখতে চান উভয়ই। এসময় তারা ভূয়া আইডি কার্ড দেখান।
সীমা জানান, আমার সন্দেহ হলেও ভয়ে বলতে পারি নি। তারা আমাদের জুস খাওয়ায়। জুস খেয়ে আমরা দুজনই অজ্ঞান হয়ে পড়ি। এরপরে আমাদের কিছু মনে নেই।
সীমা ও কুলসুম জানান, সদরঘাট লঞ্চঘাটে গিয়ে তাদের হুশ হয়। তাও ঠিকভাবে মাথা কাজ করছিল না। সাকিব ও কুলসুম কেবিন ভাড়া করেন। সেখানে সাকিব রাতভর কুলসুমকে ধর্ষণ করেন।
তবে সীমা ও মারুফ কেবিন না পাওয়ায় তারা লঞ্চের ছাদে চলে যান। কিছুক্ষণ পর স্টাফদের স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে এক হাজার টাকায় স্টাফদের থাকার কেবিন ভাড়া করেন। সেখানে মারুফ সীমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন বলে দাবি করেন সীমা।
ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মারুফ জরুরি কাজ বলে ঢাকায় চলে আসে। সীমা কুলসুম ও সাকিবকে সব খুলে বলে। সাকিব মারুফকে প্রতারক আর ভন্ড দাবি করে সীমাকেও তার সাথে যশোর ঘুরে আসতে বলে।
লঞ্চটি খুলনার তুশখালি এলাকায় থামলে সেখানে তারা নেমে যান। সেখান থেকে বাস যোগে যশোর বেনাপোল। সেখানেই র্যাব তাদের গ্রেফতার করে। সেখান থেকে উদ্ধার হয় সীমা ও কুলসুম।
কুলসুম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আগে বুঝলে দেখাই করতে যেতাম না। বিয়ের ইচ্ছে ছিল না আমার। সেকারণে আমাকে অজ্ঞান করে নিয়ে যায়।
কুলসুম বলেন, কেউ যেন মোবাইল ফোনের এমন কোনো প্রতারকের ফাঁদে পা না বাড়ায়। কাউকে যেন বিশ্বাস না করেন।
সীমা ও কুলসুম বলেন, পাচারকারিদের যেন দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি হয়। যাতে আর কোনো নারীকে এভাবে চক্রান্তের শিকার হতে না হয়।
র্যাব-২ এর অধিনায়ক(সিও) কেএম আজাদ টাইমনিউজবিডিকে জানান, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করার উদ্দেশ্যে সীমা ও কুলসুমকে যশোরে নিয়ে যান পাচারকারীরা।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাচারকারি চক্রের সদস্য ডালিম মোল্যা (২৭), পল্টু সরদার (৪২) ও সাকিব (৩০)কে গ্রেফতার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সাভার থেকে মারুফকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত চারজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে একথা স্বীকার করেছেন যে, দুই লাখ টাকার চুক্তিতে সীমা ও কুলসুমকে ভারতে পাচার করার কথা ছিল।
কেএম আজাদ আরো জানান, সাকিব ও মারুফের দায়িত্ব হলো, নারী ও শিশু সংগ্রহ করে বেনাপোলে পল্টু ও ডালিমের কাছে পৌছে দেওয়া। আর পল্টু ও ডালিমের কাজ হলো, নারী ও শিশুদের বর্ডার ক্রস করে পার করানো।
মারুফের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা বিন্নাপুরি গ্রামে। আর অন্য সবার পরিচয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা সবাই একেকবার একেক পরিচয় দিচ্ছেন। পরিচয় যাচাই বাছাই করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু পাচার আইনে একটি মামলা করা হয়েছে বলে জানান র্যাব-২ সিও আজাদ।
জেইউ/এসএইচ





