বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) খুলনায় র‌্যাব-৬-এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। সুন্দরবনের বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং খুলনাসহ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “অস্ত্রধারী এবং সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় নেই। কোনো আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতার নাম পাওয়া গেলে তাদেরও কোনো ক্ষমা নেই।” তিনি বলেন, এ বিষয়ে র‌্যাব ও সরকারের নীতি পরিষ্কার। অপরাধী যে-ই হোক এবং যেখানেই থাকুক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে শান্তি ফিরিয়ে আনাই র‌্যাবের অন্যতম লক্ষ্য। সুন্দরবনে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত খোঁজ রাখছে। যারা অপরাধীদের অর্থের জোগান দেয় কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন পরবর্তী সময়ে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে এবারের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন আটজন। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা কারণ, হয়রানির আশঙ্কা এবং ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতার কারণে কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবন থেকে আবার অপরাধের পথে ফিরে গেছেন বলে জানান তিনি।

আহসান হাবিব পলাশ বলেন, যারা আত্মসমর্পণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে যারা আত্মসমর্পণ করবেন, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবার আগের তুলনায় আরও কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের যাতে টেকসইভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়, সে লক্ষ্যে পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এবার আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতার বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান এবং একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল। বিপুল পরিমাণ গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাকে সুন্দরবনে দস্যুতা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছে র‌্যাব।

র‌্যাব সূত্র জানায়, সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যুদের দমনে র‌্যাব, কোস্টগার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রি-স্টার্ট, পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানের পাশাপাশি দস্যুদের অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক জানান, সুন্দরবনে বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদের অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের জন্য পুনর্বাসনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। তবে কেউ আত্মসমর্পণের সুযোগ না নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রেস ব্রিফিংয়ে কথা বলেন আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে র‌্যাব কাজ করছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারের কাছ থেকে বিশেষ নির্দেশনা পাওয়া গেছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে বনজীবী, জেলে ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। দস্যুদের আত্মসমর্পণ, অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের ফলে সুন্দরবনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

র‌্যাব বলছে, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও এ কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে যারা দস্যুদের পেছনে থেকে অর্থ, আশ্রয় বা অন্য কোনো সহায়তা দিয়ে থাকে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে অভিযান এবং পুনর্বাসন—দুই ধরনের কার্যক্রমই পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে র‌্যাব।

এমএম