শিশু সৌরভকে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনায় তীব্র সমালোচিত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকেই জেলার সর্বত্র আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ২দিন কারাগারে কিভাবে তার দিন কাটছে এ নিয়ে খুবই কৌতূহল দেখা গেছে এলাকার মানুষের মধ্যে।
অন্যদিকে তার এই দুর্দিনে পাশে পাচ্ছে না দলীয় কোনো সমর্থন। আদালতে হাজিরের দিন কিছু সমর্থক এমপি লিটনের পক্ষে বিক্ষোভ দেখালেও দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।আর এজন্য তার মুক্তির জন্য কোনো বক্তব্য বিবৃতিও দেয়নি কেউ।গ্রেফতার হওয়ার পর দলের আনুকূল্য ও নেতাকর্মীদের সমর্থন না পাওয়ায় তার হতাশা আরো বেড়েছে।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, প্রথমদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতে কারাগারে খুবই বিমর্ষ ছিলেন এমপি লিটন। শুক্রবারও সেই মনমরা ভাব কাটেনি তার। লিটন ডিভিশন ওয়ার্ডে এখন একাই রয়েছেন। তাকে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তিনি একজন সেবক পেয়েছেন। তবে নির্ধারিত সময়ের পর সেবক চলে গেলে তাকে নিঃসঙ্গই থাকতে হচ্ছে। তিনি স্বল্পভোজী। শুক্রবার তিনি ভাত, লালশাক, মুরগির মাংস ও ডাল দিয়ে নৈশভোজ সেরেছেন।
কারাগার সূত্রে আরও জানা গেছে, শুক্রবার দিন ভিজিটার্স আওয়ার্সে তার সঙ্গে বড় বোন আফরোজা বারী, কাকলি বেগম ও স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি এবং বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জাভেদ আলী দেখা করেন। তারা সাধারণ কথাবার্তার পাশাপাশি তাকে কিছু শুকনো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেন। শারীরিকভাবে তিনি ভালো আছেন।
লিটনের উচ্ছৃঙ্খল জীবন : তরুণ বয়স থেকেই এলাকায় উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির যুবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন লিটন। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহাবাজ গ্রামে তার পৈতৃক বাড়ি। ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমপি লিটনের বাবা মৃত আশরাফ আলী ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। কিন্তু লিটনের পড়াশোনা এসএসসির বেশি এগিয়ে নিতে পারেননি তিনি। উচ্ছৃঙ্খল বন্ধু-বান্ধবদের নিয়েই সময় কাটত তার।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৩ সালের দিকে লিটনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের কারণে পরিবার থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জে তার বোন ও ভগ্নিপতির কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তাদের সহযোগিতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইসলাম শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
পরে ১৯৯৬ সালে সুন্দরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরে এসে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে ইসলাম শিপ বিল্ডার্সের নামে লিজ নেয়া বেসরকারি ট্রেন পরিচালনার ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় ট্রেন পরিচালনার কাজে কর্মী নিয়োগ দিতে গিয়ে চাকরির শর্ত হিসেবে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা জামানত হিসেবে নেয়া হয়। কিন্তু চাকরি শেষে সেই জামানতের টাকা কর্মীরা আর ফেরত পাননি। এমনকি অনেকে ফেরত চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বেসরকারি ট্রেন পরিচালনার ব্যবসা করার পর লিটন আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে ওঠেন।
এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮২ সালের দিকে এসএসসি পাস করার পর লিটন পীরগাছা কলেজে ভর্তি হলেও পড়ালেখা চালিয়ে যাননি। তখন তাকে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে দেখা যায়। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে এলাকায় নিরীহ মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা করতেন তিনি। এ অবস্থায় পরিবার থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জে বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এলাকার কয়েকজন রাজনীতিদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, ২০০১ সালের দিকে তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ট্রেন ব্যবসার বৈধ-অবৈধ রোজগারে ফুলেফেঁপে উঠে ২০০১ সালেই সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দ আবুল হোসেন খাজার বিরুদ্ধে কুলা মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু তার প্রাপ্ত ভোট পাঁচশরও কম ছিল।
এলাকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, ২০০৩ সালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের অবস্থা নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতির সুযোগে লিটন কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব সৃষ্টি করে দলের সভাপতি হন। এরপর থেকে তার একক সিদ্ধান্তেই দল পরিচালিত হয়।
তখন থেকে তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে দল পরিচালনা শুরু করেন তিনি। ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করা, তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা এবং সংগঠনের শৃংখলা ও ন্যায়নীতিবিবর্জিত কাজ করার অভিযোগে উপজেলা আওয়ামী লীগের ৬৭ জন সদস্যের মধ্যে ৪২ জন সদস্যের স্বাক্ষরিত এমপি লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু তখনও সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পায়। তারা দলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। ফলে দল এলাকায় দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এমপি হওয়ার পর তার উচ্ছৃঙ্খল ও বেপরোয়া আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় প্রভাব খাটিয়ে তিনি তার স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতিকেও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের য্গ্মু আহ্বায়ক পদে অধিষ্ঠিত করেন।
এছাড়াও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই এমপি লিটনের মদ্যপান আর মাতলামির মাত্রা বেড়ে যায়। অকারণে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, যেখানে সেখানে পিস্তল ও শটগানের গুলি ছোড়া, বাড়ি দখল, ভাংচুর, মারধর, গালাগালসহ কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিজ হাতে পেটানোর মতো ঘটনা ঘটান তিনি। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দল ও এলাকায় সমালোচিত হলেও তার পেটোয়া বাহিনীর কারণে মুখ খুলতে পারেননি এলাকাবাসী।
এমএইচ





