নারায়নগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের ঘটনায় জনগনের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য সিআইডিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে-এ কথা বললে তো হবে না। আইনে যা আছে তাই তো করতে হবে। আইনে না থাকলে তো আর একাধিক তদন্ত সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া যাবে না। কথাগুলো বলেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আজ (বৃহস্পতিবার) সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
এর আগে এই মামলার তদন্ত থেকে সিআইডিকে অব্যাহতি দিতে হাইকোর্টে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। বৃহস্পতিবার এ মামলার শুনানি শেষ আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন নামঞ্জুর করে আদেশ দেয়। বিচারপতি মো রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।
আদালতে মামলার শুনানিকালে আদালত এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,"অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার তদন্ত করবে না, তবে তারা অনুসন্ধান করতে পারবে। আইনে নাই (লিগ্যাল কন্ডিশন)নাই বলে দিলেই তো হবে না। জনগনের ধারনা এটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সব চেষ্টা হচ্ছে। (লেট দ্যা কমপিউশ বি রিমুভড) সকল সন্দেহ দূর করতে হবে।"
আদেশে আদালত বলেছেন,‘ইনভেস্টিগেশনের জায়গায় ইনকোয়ারি হবে।’এতে সিআইডি ওই মামলার অনুসন্ধান করতে পারবে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সকালে ওই আবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশ অনুসারে বিবাদীদের কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরেন তিনি। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আদালত আদেশ দেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মামলায় ডিবি তদন্ত করছে। সকল আলামত সংগ্রহ করছে। এমতাবস্থায় সিআইডিকে দিয়ে তদন্ত করলে একটা ঝামেলা হতে পারে। এমনকি মামলা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে’।
তিনি বলেন,আমরা সিআইডিকে তদন্ত থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আদালত বলেছে সিআইডি তদন্ত করবে না, কিন্তু অনুসন্ধান করবে। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশ পাওয়ার পর আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলেও জানান মাহবুবে আলম ।
মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্ট যখন এ মামলার তদন্ত করতে সিআইডিকে দায়িত্ব দেন তখন আমরা আপিল বিভাগে গিয়েছিলাম। আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে আবেদন করতে বলেছিলেন।
তিনি বলেন, জনগনের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য সিআইডিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এ কথা বললে তো হবে না। আইনে যা আছে তাই তো করতে হবে। আইনে না থাকলে তো আর একাধিক তদন্ত সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া যাবে না।
বৃহস্পতিবার আদালতের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নারায়নগঞ্জের ঘটনায় জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি, র্যাব,, সিআইডি ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের জমা দেয়া তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করার পরে তিনি তা পাঠ করে শোনান। এরপর আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত।
শুনানিতে সিআইডির তদন্তের বিষয়ে আইনজীবী শামিম সরদার বলেন," আদালতকে আমরা বলেছি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে (অ্যাসেসমেন্ট করতে)। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য প্রয়োজনে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের আবেদন জানানো হয়। বর্তমানে আইনের কথা বলে সিআইডিকে সঠিকভাবে তদন্ত করতে দেয়া হচ্ছে না। আলোচিত এই ঘটনার তদন্তে সিআইডি না থাকলে অন্যরা যা ইচ্ছা তাই তদন্ত করবে। সুতরাং সিআইডিরও তদন্ত করা দরকার।
গত ৪জুন শুনানিতে সিআডির তদন্তের প্রশংসা করেছিল হাইকোর্ট। তখন আদালত বলেন, দায়িত্ব দেয়ার পর প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংবলিত অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে আসছিল অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। র্যাব, সিআইডি, পুলিশ ও সরকারি তদন্ত সংস্থার পাঠানো অগ্রগতি প্রতিবেদনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সিআইডির প্রতবেদনই ছিল তথ্যবহুল। আর সে কারণে আদালত সিআইডির প্রতিবেদন দেখে প্রশংসাও করে।
এ অবস্থায় অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়ে শুনানিকালে এই সংস্থাটিকে তদন্ত থেকে বাদ দেয়ার জন্য আদালতের কাছে বারবার মৌখিক আবেদন করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে বলেছিলেন, সাত খুনের ঘটনায় করা হত্যা মামলাটি শুরু থেকেই তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা তদন্তে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন ডিবির পাশাপাশি সিআইডিও তদন্ত করবে। কিন্তু ডিবির পাশাপাশি সিআইডি তদন্ত করলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আদালত বলেছিলেন, অধিকতর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও পাবলিক পারসেপশন (জনগণের ধারণা) ভালো রাখার জন্যই এই ধরনের আদেশ দেয়া হয়েছে। এখানে দুটি সংস্থার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
এদিকে বরাবরের মতোই সিআইডির প্রতিবেদনে এবারও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে। সোমবার অ্যাটর্নি কার্যালয়ে সিআইডি তাদের অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠায়।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ঘটনার সঙ্গে র্যাবের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম জানার জন্য সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তার দেয়া জবানবন্দির কপি প্রয়োজন। এজন্য আসামিদের কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় যে জবানবন্দি নেয়া হয়েছে, তা চেয়ে নারায়ণগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়েছে। ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি না দেয়ায় তদন্ত পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়াও প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল যা সরকারের জন্য বিব্রতকর বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, এসব কারণেই মঙ্গলবার সিআইডির প্রতিবেদনটি সংশোধন করতে অ্যাটর্নি কার্যালয় থেকে ফেরত পাঠানো হয়। এছাড়া অ্যাটর্নি কার্যালয়ে সিআইডির প্রতিবেদন জমা পড়েছে কিনা তা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ লুকোচুরি শুরু করে। সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতেও অস্বীকৃতি জানান।
গত ৫ মে নারায়নগঞ্জের ঘটনায় ডিবির পাশাপাশি সিআইডিকেও মামলার তদন্ত করতে আদেশ দেয় হাইকোর্ট।একই সঙ্গে এ ঘটনায় র্যাবের কোন সাবেক বা বর্তমান সদস্যের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেও বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে আইনমন্ত্রণালয়ের দুইজন, স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুইজন এবং জন প্রসাশন মন্ত্রণালয়ের দুইজনসহ মোট সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় আদালত।
উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহূত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন।
ঢাকা, কেএ, ১০ জুলাই(টাইমনিইজবিডি.কম) কেবি





