ভারতে চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণের পর খুন হওয়া বাংলাদেশী নারী নার্গিস আক্তারের লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রোববার বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদেশে খুলনার ফরেনসিক বিভাগকে নার্গিসের ময়নাতদন্ত করতে বলা হয়।

খুলনা জেলা পুলিশ কমিশনার ও সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামী ১৬ জুনের মধ্যে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়।

একই সাথে নার্গিসের লাশ ভারত থেকে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় পাওয়া সকল কাগজপত্র দাখিল করতেও বলা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এডভোকেট এলিনা খানের সাথে কথা বললে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, নার্গিসের বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক। এমন ঘটনা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দায়ের করার পর আজ (রোববার) শুনানি হলো এবং আগামী ১৬ জুন পোস্টমর্টেমের প্রতিবেদন খুলনার পুলিশ কমিশনার ও সোনাডাঙ্গা থানার ওসিকে হাইকোর্টে জমা দিতে বলা হয়েছে। আশা করছি সুফল আসবে।

নিহত নার্গিস আক্তারের মামী রাহেলা বেগমের পক্ষে গত বুধবার দুপুরে অ্যাডভোকেট এলিনা খান হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট দায়ের করেন। স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিসি খুলনা এবং খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গা থানার সংশ্লিষ্ট এসআইকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

নিজের ও জন্মান্ধ মায়ের চিকিৎসার জন্য ১০ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন নার্গিস বেগম (৩৪)। দরজির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। চিকিৎসা শেষে আজমির শরিফ ঘুরে আসারও ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু সেই ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল। দীর্ঘ ৪০ দিন পর লাশ হয়ে দেশে ফিরলেন তিনি।

ভারতে চলন্ত ট্রেনে দুর্বৃত্তরা নার্গিসকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল দুপুরে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্থানীয় অভিবাসন পুলিশের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করে ভারতীয় পুলিশ। নার্গিস খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোডের বাসিন্দা শাহাবুদ্দিনের মেয়ে।

উল্লেখ্য, রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল-ক্লিনিকেও নারীরা শ্লিলতাহানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।  বাসা থেকে বের হতেই  বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানি, শ্লীনতাহানি ও ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

সম্প্রতি দেশের এবং দেশের বাইরেও বাংলাদেশী নারী ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, শ্লীনতাহানি ও ইভটিজিংয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এবং নতুন একটি পদ্ধতি হলো ধর্ষনের পর হত্যা। এসব ঘটনায় মামলা হলেও মামলার তদন্ত ও চূড়ান্ত রায় প্রকাশে ধীর গতি থাকায় অপরাধীরা রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

আর এমনই নির্মমতার শিকার হলেন বাংলাদেশী নার্গিস বেগম। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ই মার্চ যশোর বেনাপোল বন্দর দিয়ে নার্গিস বেগম (৩৪) তার মেয়ে কাকলী (১০) এবং অন্দ্ধ মা আনোয়ারা বেগমকে  উন্নত চিকিৎসার জন্য বৈধ পন্থায় পাসপোর্টযোগে ভারতের উদ্দেশে হাওড়া পৌছান। 

রাতে দিল্লির টিকিট আনতে গেলে তাকে জানানো হয় দিল্লির টিকিট পরদিন সকাল ১০টায় পাওয়া যাবে। ফলে রাত হাওড়া স্টেশনেই কাটান তারা। ১০ মার্চ সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৩৫৫ টাকা করে ট্রেনের টিকেট কিনে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। দিল্লি পৌছলে সহযাত্রিদের জাগিয়ে দেওয়ার কথা বলে নার্গিস ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত সাড়ে ৩টার দিকে ৪/ ৫ জন যুবক তাদেরকে বলে দিল্লি এসে গেছে, সবাই নামেন। এসময় সবাই ট্রেন থেকে নেমে যায়। ট্রেনে থাকা ল্যাগেজ নিতে গিয়েই নার্গিস আর ফিরতে পারেননি। লাল পতাকাবাহী ট্রেনের বগিতে থাকা গার্ডরা তাকে কাপড় দিয়ে মুখ চেপে বগিতে তুলে ট্রেনটি ছেড়ে দেয়।

ছোট্ট কাকলী এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করে, নানী মাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় তার মা ও কন্যা চিৎকার দেয়, ‘ওকে বাঁচান, ওকে ছেড়ে দেন।’ কেউ রাখেনি তাদের কথা, শোনেনি চিৎকার। আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু কারো সাহায্য চাওয়ার আগেই ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে যায়।

পরে ১৬ মার্চ অবৈধ পথে নার্গিসের অন্ধ মা ও কন্যাকে বাংলাদেশে পাঠায় সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা। ছয়দিন পর মারা যান নার্গিস। হঠাৎ একদিন খুলনা সোনাডাঙ্গা থানার পুলিশ তার মাকে জানায়, তোমার মেয়ে ভারতে মারা গেছে। লাশের সাথে ৩টি পাসপোর্ট পাওয়া গেছে তাতে তোমাদের ঠিকানা রয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকে উত্তর প্রদেশের পুলিশ প্রধান জানিয়েছিলেন, নার্গিসকে ধর্ষন করা হয়নি তাকে ট্রেনের নিচে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, নার্গিসকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় ট্রেন কর্মচারীরা। আগ্রা মেডিক্যাল মর্গে রাখা হয় লাশটি।

দীর্ঘ ৪০ দিন পর হতভাগ্য নারীর লাশ বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠায় ভারত সরকার। ওপারের পেট্টাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং বিএসএফ সদস্যরা বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বিজিবির কাছে লাশ হস্তান্তর করেন।

২০ এপ্রিল সকাল ৯টায় বেনাপোল স্থলবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নার্গিসের লাশ বুঝে পান তার পরিবার। ইমিগ্রেশন উপপুলিশ পরিদর্শক আনিস ও হাসানুজ্জামান লাশটি গ্রহণ করে আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।

ওই দিন দুপুরে স্থানীয় কবরস্থানে নার্গিসের লাশ দাফন করা হয়। দাফন করার আগে নার্গিসের লাশ গোসল করান লাইলি বেগম।

তিনি বলেন, নার্গিসের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর চিহ্ন রয়েছে। বাঁ পায়ের গোড়ালি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সঙ্গে কোনো রকমে আটকে রয়েছে। ডান হাত কাঁধ থেকে ভাঙা।

সম্প্রতি রাজধানীর ভাটারা থানাধীন কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাতে এক আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণ করে পাঁচ যুবক। এমন অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করে মামলা (মামলা নং ২৬) দায়ের করেন। তবে এ ঘটনায় আসামিদের কেউ ধরা পড়েনি।

গত শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে এক তরুণীকে (১৮) লাঞ্ছিত করার অভিযোগে জড়িত মো. ইউসুফ (৩০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় অপর এক যুবক পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী ওই তরুণীর পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের অবহলায় অপর লাঞ্ছনাকারী যুবক পালিয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, যেভাবে নারীদের ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, শ্লীনতাহানি ও ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা এতে প্রকট হয়ে উঠছে।

এমআর, কেবি