শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ সংক্রান্ত এক রুল জারি করেছে হাই কোর্ট। নয় মাস বয়সী এক শিশু ও তার মায়ের করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আজ রোববার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
সরকার পরিচালিত-নিয়ন্ত্রিত বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, হাসপাতাল, শপিং মল, বিমানবন্দর, বাস স্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশনের মত জনসমাগমস্থলে ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চেয় হাই কোর্ট।
ওইসব স্থানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না এবং ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে একটি প্রস্তাব তৈরির জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তাও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, গণপূর্ত সচিব, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন সচিব এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আব্দুল হালিম, অ্যাডভোকেট রাশিদুল হাসান ও জামিউল হক ফয়সাল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ।
আব্দুল হালিম পরে সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে নয় মাস বয়সী শিশু উমাইর বিন সাদী এবং তার মা ইশরাত হাসান এই রিট আবেদনটি করেন।
সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান“ইশরাত সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি তার বাচ্চাকে নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার সময় ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ধরতে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ সময় কোথাও তিনি ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার খুঁজে পাননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।”
এই আইনজীবী বলেন, “স্মোকিং জোন আছে, কিন্তু ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই, বেবি কেয়ার জোন নেই… সারাদেশেই কিন্তু এ অবস্থা। বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদনও হয়েছে। তারপরও সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। তাই এই রিট আবেদনটি করা হয়েছে। আদালত রুল জারি করেছেন।”
শিশুটির মা ইশরাত হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে গত সপ্তাহে তিনি এবং তার সন্তান আদালতে রিট আবেদনটি করেন। সন্তানের পক্ষে হলফনামা করেছেন তার বাবা।
“কর্মস্থলসহ জনসমাগমস্থলে প্রায়ই দুধ পান করানো নিয়ে মায়েদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই সমস্ত পাবালিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে হবে, যেন কোনো মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে অস্বস্তিতে না পড়েন।”
রিটে বলা হয়, এমন পরিবেশে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে হবে যেখানে কোনো মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে অস্বস্তি বোধ করবে না। বা যৌন হয়রানির শিকার হবে না। সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
রিট আবেদনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দর, সুস্থ ও সবলভাবে শিশুর বেড়ে ওঠা এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতে সরকারি বেসকারি প্রতিটি কর্মস্থলে ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ ও ‘মাতৃদুগ্ধদান কক্ষ’ স্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
এরপর নয় বছর অতিবাহিত হলেও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েদের জন্য নেই ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে, কর্মক্ষেত্রে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে যেন একজন কর্মজীবী মা সমর্থ হন সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিমা-ব্যাংক, শপিং মল, কল-কারখানা, পেশাজীবী সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালসহ অফিস, ব্যাংক-বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শপিংমলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়নি। ফলে একদিকে যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ পান কর্মসূচি। অন্যদিকে শিশু স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের জন্য বলা হলেও মানছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মা যদি কর্মস্থলে শিশুকে তার চাহিদা অনুযায়ী বুকের দুধ ও ঘরে তৈরি বাড়তি খাবার খাওয়াতে পারেন তার সুফল অনেক। সবচেয়ে বড় সুফল শিশুর সুস্থতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের এক জরিপে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ শিশু খর্বকায়, আর ৩৩ শতাংশ শিশুর ওজন কম, ১৪ ভাগ শিশু কৃশকায় (লম্বার তুলনায় ওজন খুবই কম)। এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের যে হার একশ ভাগ হবার কথা, সেখানে আমাদের রয়েছে ৫৫ শতাংশ। শিশুর পুষ্টিমান নিশ্চিতে সব জায়গায় ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ চালু করার প্রয়োজন।
এএইচ





