রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী মাজার থেকে দু’বছর আগে নারী পাচারকারীদের কাছে বিক্রি হয়ে যান মনিরা (ছদ্দ নাম)। জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশ্ব মানব পাচার দিবস উপলক্ষ্যে ১৫টি মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ ঘোষণার এক আলোচনা সভায় মনিরা কিভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে আবার ফিরে আসেন তার লোমহর্ষক কাহিনী শুনিয়েছিলেন।

বর্তমানে  মানবপাচার পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা অপরাধমূলক কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম একটি। ধারণা করা হয় বর্তমানে এটি অর্থনৈতিকভাবে মুনাফা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম খাত। আর অবৈধ অর্থসংস্থানের একটি প্রধান উৎস।

প্রতি বছর আনুমানিক ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ পাচারের শিকার হন। পাচারকারীরা ভিক্টমদের ব্যবসারপণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। নানা ধরনের শোষণ ও নির্যাতনসহ গৃহ দাস, শ্রম দাস, পতিতা, বাণিজ্যিকভাবে যৌন শোষণ, জোর পূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি, শিশু সৈন্য, মানবদেহের অঙ্গপাচারের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হয় এসব পাচার হওয়া নারী ও শিশুদের।

সাধারণত সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেমন, শিশু, বেকার চাকরি প্রার্থী এবং এমন সব পরিবারের জনগোষ্ঠী যাদেরকে প্রতিমূহুর্তে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই করতে হয় তারাই পাচারের শিকার হয়ে থাকেন।

এমনই এক নির্মম পাচার চক্রের শিকার হয়েছিলেন মনিরা। তখন তার বয়স মাত্র ১৩ বছর। খালাত ভাই সুমনের (ছদ্দ নাম) সাথে তাকে বিয়ে দেন যখন সুমনের বয়সও মাত্র ১৮বছর।

টাইমনিউজের সাথে আলাপকালে মনিরা জানান, স্বামীর বয়স কম ও খালাত ভাই হওয়ায় এ বিয়ে মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। মা জোর করে খালাত ভাই সুমনের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের দুই মাসের মাথায় সুমনকে ডিভোর্স দেয় মনিরা। ২০ দিন হল মনিরা ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। বাড়ি বগুড়ায়। বর্তমানে সুমনের সাথেই সংসার তার।

২০১৩ সালে স্বামী সুমনকে ডিভোর্স দিলে মনিরার মা বকাবকি করেন ও জোর করে সুমনের বাড়ি রেখে আসেন। পরের দিন মনিরা পালিয়ে ঢাকায় আসেন একটি চাকুরির আশায়। রাজধানীর মিরপুরে পরিচিত এক বান্ধবীর বাসায় অবস্থান নেন মনিরা।

দু’দিন সেখানে অবস্থানের পর একদিন বিকালে মনিরা মিরপুর শাহ আলীরমাজারে নিজের চাওয়া-পাওয়া ও মনের আকুতি জানাতে যান, অনেক কান্নাকাটি করেন, আবেদন-নিবেদন করেন।

হঠাৎ তার সামনে এক ভদ্র নারীর আবির্ভাব হয় এবং ওই নারী মনিরার কাছে তার মাজারে আসার বিষয় ও চাওয়া–পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চান।

মনিরা জানান, ‘ওই নারী আমাকে দেখে বললেন ‘মা’ কি সমস্যা তোমার। আমি একটা কাজ খুজঁছি এই কথা বলি তাকে। উনি (নারী) আমাকে ঢাকার বাইরে একটা পার্লারে কাজ জুটিয়ে দেয়ার কথা বললেন।

এরপর আমাকে সাথে করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। আমার সামনেই ওই নারীর সাথে কিছু ছেলের অর্থ লেনদেন হয়। তখন ‘আমি বুঝতে পারছিলাম বিক্রি হয়ে যাচ্ছি।’

তারপর সন্ধ্যায় গাবতলী থেকে মনিরাকে বাসে করে বেলাপোলে নিয়ে একটি বাড়িতে রাখে নারী পাচারকারী চক্র। পরের দিন সন্ধ্যায় ওই চক্রের সদস্যরা মনিরাকে এই বলে সতর্ক করেন, ‘তোমার কাছে পাসপোর্ট নেই। তুমি চুপ করে থাকবা। পুলিশ বুঝতে পারলে আর কোনো দিন বাড়ি ফিরতে পারবা না। সারা জীবন জেলে কাটাতে হবে।’

বেনাপোলে একদিন রাখার পর আমাকে সীমান্ত রক্ষীদের সামনে দিয়েই ওইপাড়ে নিয়ে যায়। তখনও তারা আমাকে বলছে ভারতের একটা পার্লারে কাজ হয়েছে আমার।

এরপর ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আরো একদিন আমাকে রাখা হয়। এরপর ট্রেনে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।

স্থান হয় কলকাতার সাত তলার একটি বাড়িতে। দেখি  প্রায় তিন’শ মেয়ে ওখানে গাদাগাদি করে রয়েছে। ওদের দেখলেই বুঝা যাচ্ছিল খারাপ কাজের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

দালাল আমাকে দেখে বলল, তোমার দালাল দেড় লাখ টাকায় আমার কাছে বিক্রি করেছে, তুমি তো ছোট মেয়ে, তোমাকে দিয়ে হবে না। বরং আমার কাছে থাক। ওখানে থাকা পুরুষরা আমাকে দেখার পর বিভিন্ন রকম অশুভন ও বাজে মন্তব্য করতে লাগল। দালালের কাছে বেশ কিছুদিন থাকার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলাম। মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে।

একদিন সকালে টয়লেটের ভাঙ্গা জালানা দিয়ে সাত তলা বিল্ডিংয়ের উপর থেকে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আমি দৌঁড়াতে থাকি। কোনো ঠিকানা আমার জানা ছিল না। শুধু চেষ্টা করছিলাম কোনো গ্রামে ঢুকে পড়ার জন্য। কিছুদূর দৌড়ানোর পর আমি একটা গ্রামে ঢুকে পড়ি, এরপর ওখানকার স্থানীয়রা আমাকে দেখে বুঝতে পারে আমি কোনো বিপদে পড়েছি। তারা আমাকে সেখানকার রেসকিউ ফাউন্ডেশন হোমে নিয়ে যান। সেখানে দুই বছর ছিলাম। ওই সেইফ হোম থেকেই বাংলাদেশে আমার বাড়ির সাথে যোগাযোগ করা হয়। পাসপোর্টসহ অন্যান্য বিষয়ে আমাকে ফিরিয়ে আনতে রাইট যশোর সহযোগিতা করে।

বর্তমানে মনিরা স্বামী সুমনের সাথে বগুড়া রয়েছেন। যখন বুঝতে পেরেছেন বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন, তখন কেন পালালেন না এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরা টাইমনিউজকে বলেন, সে বুদ্ধি ও সাহস তখন আমার ছিল না। আর বাড়ি ফিরে যাব না বলেই ওদের সাথে গিয়েছিলাম পার্লারে কাজ করব বলে।

মনিরার মত আরো অনেকে পাচারের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। যারা সামাজিক পরিচয়ও আত্নমর্যাদার ভয়ে মুখ খুলতে চান না।

যশোর রাইটার্স আয়োজিত এক আলোচনা সভায় কর্কট (ক্যান্সার) রোগী স্বামীও এক ছেলে দু’মেয়ে সন্তান রেখে স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করা ও পরিবারের হাল ধরতে কাতার প্রবাসী মমতাজের (ছদ্দ নাম) প্রবাস জীবন ও দৈহিক নির্যাতনের আর্তচিৎকারের কথা শুনেছিলাম।

মমতাজের স্থান হল কাতারের এক ভদ্র লোকের বাড়িতে। নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই।  ঝাড়ামোছা থেকে শুরু করে কাপড় কাচাঁ পর্যন্ত সবই তার কাজের অন্তর্ভূক্ত ছিল। দিন কি রাত কোন বিশ্রামের সুযোগ নেই। অপারগতা প্রকাশ করতেই তার উপর নেমে আসত দৈহিক নির্যাতন।

সেই নির্যাতনে মমতাজের এক পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে, ভাল সিকিৎসার অভাবে এখনও তাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটতে হচ্ছে। এসব বলতে বলতে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ থেকে যদিও বিভিন্ন স্কেলের বেতনের কথা বলে মধ্য প্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী নেয়া হয় কিন্তু বাস্তবে সেখানে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

এসব কাজে সরাসরি যুক্ত থাকে নামী দামী সব এজেন্সি। এসব এজেন্সির লোকেরা যে দেশে নারী কর্মী পাঠান, সে দেশের দালালদের কাছে বিক্রি করে দেন। কিন্তু ওই নারী কর্মী একবারের জন্যও জানতে পারল না সে বিক্রি হয়ে গেছে।

মমতাজ জানান আমি সে একইভাবে আমার অজান্তেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুধু কান্না করতাম, দেশে ফিরে আসার জন্য যখন আকুতি জানাতাম তখন আমাকে বাসার ভদ্র লোকটি বলত তোমাকে দু’বছরের জন্য কিনে নেয়া হয়েছে।

মমতাজ বলেন, আমি আমার স্বামী ও রেখে যাওয়া বাচ্চাদের জন্য চিন্তা করতাম। তাদের জন্য দু’ বছরে এক টাকাও পাঠাতে পারিনি। অন্য দিকে ঋণের টাকাও অনেক বেড়ে যাচ্ছিল-এসব বলতে বলতে মমতাজ বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন।

যাতে আর কোনো নারীকে প্রতারণার শিকার হয়ে নারী কর্মীর নামে জীবন সংসার সাজাতে সব কিছু হারাতে না হয় সে জন্য সরকারসহ দায়ীত্বপ্রাপ্ত সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান মমতাজ।

মানবপাচার আইন ২০১২ এর ৩ (১) নং আইনে বলা হয়েছে, জবরদস্তি বা দাসত্বমূলক শ্রম বা সেবা প্রদান করিতে বাধ্য করলে যাবৎজীবন কারাদণ্ড এবং অনূন্য ৫ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অনূন্য ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৭ নং ধারায় বলা আছে, কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী একাধিক সদস্য গোষ্ঠীর সকল সদস্যের সাধারণ অভিপ্রায় সাধনের উদ্দেশ্যে কোনো আর্থিক বা কোনো বস্তুগত বা অবস্তুগত মুনাফা অর্জনের নিমিত্ত আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করিলে উক্ত গোষ্ঠির প্রত্যেক সদস্য উক্ত অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত হবে এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা অনূন্য ৭ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অনূন্য ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এসব আইন থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারীতা না থাকায় অপরাধীরা তাদের অপরাধ কর্ম করেই চলছে। মানবপাচার বন্ধে আরো কঠোর ও যুগপযোগী আইন ও তা বাস্তবায়রনর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

সম্প্রতি মালেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে কি পরিমাণ মানুষ পাচার হচ্ছে তা মিডিয়াতে প্রকাশ পেলেও আরো কি পরিমান মানুষ পাচারের শিকার হয়ে দাসের জীবন কাটাচ্ছেন বা গণকবরে স্থান হয়েছে কতজনের তা অনুমানের বাইরে।  

এমএ/কেএইচ/কেবি