ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে ৮ বছর আগে হাইকোর্টে করা কয়েকটি রিট আবেদন করা হলে আদালত রুল জারি করেন। কিন্তু রুল জারি পর্যন্তই যেন শেষ, এ পর্যন্ত এসব রিট আবদেনের কোন নিষ্পত্তি হয়নি।
আদালত সূত্র জানায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল থেকে এ পর্যন্ত তিনটি রুল জারি করেছেন আদালত। আদালতের জারি করা রুলের নিষ্পত্তি করা যায়নি সরকারের ঢিলেমির কারণে।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একটি রিট আবেদনে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি ঘটনার বিষয়ে রুল জারি করেন। তবে এই রিটেরও নিষ্পত্তি হয়নি। সরকারের অনিহার কারণেই শুনানি হয়না বলে জানায় আদালত সংশ্লিষ্টরা।
গত ২০০৬ সালের ২৫ মে কথিত সন্ত্রাসী টুন্ডা ইসমাইল নিহত হওয়ার পর প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)।
এই রিট আবেদন করছিলেন এইচআরপিবি'র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
প্রথম ওই রিটের অধিকতর শুনানীর জন্য বিচারপতি মো. আওলাদ আলী ও বিচারপতি জিনাত আরার হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যা বন্ধের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জনতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। কিন্তু এখনো ওই রুলের জবাব দেয়নি সংশ্লিষ্টরা।
জানতে রিট আবেদনকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, রুলের জবাব দেয়া হয়নি। তৎকালীন বা বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কোন ব্যাক্তি অথবা কোন বিভাগ এখনও ওই রুলের জবাব দেয়নি । একারণে রুলের শুনানি করা সম্ভব হয়নি।
রিট কিভাবে নিষ্পত্তি করা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  এ বিষয়ে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। তাছাড়া রিট আবেদনগুলোর কখনো নিষ্পত্তিতো দূরের কথা শুনানিও সম্ভব নয়।
এর পরে গত ২০০৯ সালের ২১ জুন মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট ( ব্লাস্ট) ও কর্মজীবী নারী সংগঠন জনস্বার্থে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে।
ওই রিট আবেদনে হাইকোর্ট সরকারের প্রতি কেন ক্রসফায়ারে হত্যা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এ ঘটনায় জড়িতদের কেন আইনের আওতায় শাস্তি দেওয়া হবে না, তা জানতে পৃথক দু'টি রুল জারি করেন। কিন্তু ওই রুলের জবাবও দেয়নি সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি ও বিভাগ।
গত ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বরে মাদারীপুরে দুই সহোদরকে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনায় সর্বশেষ হাইকোর্টের বিচারপতি এএফএম আব্দুর রহমান ও বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদ সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন।
রুলে মাদারীপুরে দুই সহোদরের বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
এরপর একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের ওই বেঞ্চে শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ সময় চাইলে আদালত রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সরকাকে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ার বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু আজও সরকার তার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে ক্রসফায়ারকে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এরপর গত ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি ওই রুলের শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তন হলে এখনো পর্যন্ত কোনো শুনানি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথম রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, এই রুলের শুনানির জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের তিনটি বেঞ্চে রিটটি শুনানির জন্য উত্থাপন করা হয় এবং কার্যতালিকায়ও আসে। কিন্তু বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তনের কারণে শুনানি করা সম্ভব হয়নি।
রিট আবেদনগুলো এভাবেই অপেক্ষমান থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিট আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য আবারো শুনানির চেষ্টা করবো।
তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রতিটি রুল নিষ্পত্তি হওয়া অতীব জরুরি। তা না হলে এখন যেভাবে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড চলছে, আগামীতে এর মাত্রা আরো বাড়বে।
বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যার বিরুদ্ধে করা রিট ও রুলের নিষ্পত্তি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেন, বিচার বিভাগ এই ধরনের বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ার বন্ধের উদ্যোগ নিলেও সরকারের কোন আন্তরিকতা না থাকায় এই হত্যা বন্ধ কার সম্ভব হয়নি।
সরকার কেন আন্তরিক নয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যখন যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তখন ওই সরকার চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যাবহার করতে।
তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে সরকারের আন্তরিকতার কোন বিকল্প নাই।
তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের নিরাপত্তার বাহিরে কোন দলীয় কাজে ব্যবহার করা ঠিক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যার্টনি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, বিচারবর্হিভূত হত্যা কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য নয়। সরকার এই ধরণের হত্যা বন্ধের জন্য বদ্ধ পরিকর।
তিনি বলেন, আমরা এই ধরণের প্রত্যেকটি হত্যার তদন্তস্বাপেক্ষে বিচার করতে চাই। এই জন্য আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।
মাহবুবে আলম বলেন, দেশকে উন্নত দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনের শাসনের কোন বিকল্প নেই। আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ২৯ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জিই / কেবি[/b]