২০০৮ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর পুলিশের এএসআই পদে যোগ দেন জাহিদুর রহমান। চাকরি পেয়েই যেন তিনি পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। এ পাঁচ বছরে তিনি কোটিপতি বনে গেছেন। পল্লবীর বাউনিয়াবাদ ইসলামিয়া মাদরাসার পাশে চার কাঠার প্লট কিনেছেন। গ্রামের বাড়িতে কিনেছেন ৩০ বিঘা জমি। রূপনগর থানার পাশে তিন রুমের ফ্ল্যাটও কিনেছেন।

অল্প সময়ের চাকরি অবস্থায় তার এত সম্পদ নিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনে চলছে তোলাপাড়। অনুসন্ধান ও সরজমিন এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মিরপুরে ব্যবসায়ী হত্যার অভিযোগে জাহিদকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে এমন হত্যার অভিযোগ ওঠে।

শনিবার রাতে পুলিশ হেফাজতে ঝুট ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান সুজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে মিরপুর থানার এসআই রকিবুর রহমান গতকাল সকালে ৮ জনকে আসামি করে ৩০২/৩৪ প্যানেল কোডে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

আসামিরা হলেন, এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাজকুমার, কনস্টেবল রাশেদুল ইসলাম, কনস্টেবল আনোয়ার, সোর্স নাসিম শেখ, পলাশ, ফয়সাল ও খোকন। তার মধ্যে পুলিশ এসআই জাহিদুর রহমান ও সোর্স নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যরা পলাতক রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।

তবে সূত্র জানিয়েছে, এসআই জাহিদুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা থানায় ছিলেন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ইশারায় তারা মিরপুর থানার পেছনে থাকা কোয়ার্টার থেকে পালিয়ে যান।

এদিকে, পুলিশ এসআই জাহিদুর রহমান ও সোর্স নাসিমকে কঠোর নিরাপত্তাসহকারে ঢাকা মহানগর আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করেন। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দু’জনকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা থানার ওসির আদেশ ব্যতীত হাজারীবাগ থানার জাফরাবাদ এলাকায় অভিযান চালাতে যায়। পরে ঝুট ব্যবসায়ী সুজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে তিনি মারা যান।

নিহতের ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে, অতিরিক্ত টর্চারের কারণে সুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাই পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলো।

কিন্ত, মামলা দায়ের করাকে কেন্দ্র করে মিরপুর থানা পুলিশ ও পরিবারের পক্ষ থেকে দুই রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, যেহেতু ঝুট ব্যবসায়ী নিহতের ঘটনাটি মিরপুর থানা হেফাজতে ঘটেছে তাই পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই পুলিশ এই উদ্যোগ নিয়েছে।

কিন্তু, নিহতের পরিবারের দাবি, সুজন হত্যার পরেই তারা থানায় মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলেন। তখন তাদের মামলা নেয়া হয়নি। মামলা দায়ের না করতে তাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন রকম হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে। এখন পুলিশ নিজেই উদ্যোগী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সুজনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে এসআই জাহিদুর রহমান, থানার ওসি সালাউদ্দীন খানসহ আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত। তাদের সবাইকে আসামি করে রোববার ঢাকা মহানগর আদালতে মামলা করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর থানার ওসি সালাউদ্দীন খান বলেন, এসআই জাহিদুর রহমানের নামে অনেক অপকর্মের তথ্য আমার কাছে এসেছে। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার তো আমি কেউ না। আমি তো কর্তৃপক্ষ নই। আমার কাজ শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।

ওসি আরও বলেন, মিরপুর থানায় জাহিদ দুই মাস হলো যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন পল্লবী, কাফরুল ও শাহআলী এলাকায় চাকরি করেছেন। ওই সব এলাকায় নিরীহ মানুষকে ধরে চাঁদা আদায় ও পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নিহতের পরিবারকে মামলা করতে পুলিশ বাধা দিয়েছে কিনা প্রশ্ন করা হলে ওসি দাবি করেন, সুজন মারা যাওয়ার পরেই পুলিশ থানায় একটি জিডি করেছে। এছাড়া লাশের ময়নাতদন্তের পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে পরিবারকে আমরা জানিয়েছিলাম। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই।

সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর থেকেই এসআই জাহিদুর রহমান থানা হাজতে আছেন। গতকাল গভীর রাতে থানার ওসি হাজতের মধ্যে তার সঙ্গে কথা বলেছেন।

মিরপুর থানার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় দেখা যায়, শনিবার গভীর রাতে এসআই জাহিদুর রহমান ঝুট ব্যবসায়ী সুজন ও বাবু নামে এক যুবককে আটক করে নিয়ে আসে। সুজনের হাত পিছন দিক থেকে হাত বাঁধা। তাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছিল।

কিন্তু, বাবুর পিছন থেকে হাত বাঁধা ছিল না। প্রায় ১ ঘণ্টা থানাহাজতের বাইরের অন্যকক্ষে এসআই জাহিদুর তাকে রড দিয়ে পেটান। এতে সুজন গুরুতর আহত হন। ওই অবস্থায় আবার জাহিদুর অভিযানের নামে সুজনকে হাজারীবাগের জাফরাবাদ এলাকায় নিয়ে যান।

গতকাল দুপুরে নিহতের বাসা শাহআলী এলাকায় গেলে ওই বাসায় কাউকে পাওয়া যায়নি। ওই বাসায় দুই পরিবারের লোকজন ছিল। কিন্তু, তারা ভাড়াটিয়া। নিহত সুজনের কাউকে পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন,‘তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রায় দু’দিন ধরে তাদের বাসায় এসে জোর করে জবানবন্দি নেয়ার চেষ্টা করেছেন। নইলে নিহতের যেসব মামলা রয়েছে ওইসব মামলায় পরিবারের লোকজনকে জড়ানো হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবারে সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে রূপনগর এলাকায় এই প্রতিবেদককে ডেকে কথা বলেন নিহতের মা শাহেদা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার ছেলে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়েছে। তাকে আর ফিরে পাবো না। যারা তাকে মেরেছে আমি তাদের শাস্তি চাই।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সুজন মারা যাওয়ার পরেই কথিত তদন্ত কমিটি আমাদের বাসায় এসে বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছে। তাদের কারণে বাড়ি ছেড়ে এখন স্বজনের বাসায় এসেছি।

এ বিষয়ে নিহতের বড় ভাই নজরুল ইসলাম শামীম জানান, আমার ভাই পুলিশের টর্চারে থানা হাজতে মারা গেল অথচ পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করছে। মার চেয়ে মাসীর দরদ বেশি! তিনি আরও বলেন,‘ ঘটনার পরেই আমরা নিজেই থানায় মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু, তখন বিভিন্ন অজুহাতে পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি।

তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হবে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে মিরপুর থানার ওসিসহ আরও কয়েকজন এসআই জড়িত আছে। আমরা কাকে কাকে আসামি করবো তা বিবেচনা করা হচ্ছে। আইনজীবীর সঙ্গে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে। আগামী রোববার সকালে ঢাকা মহানগর আদালতে খুনিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হবে বলে তিনি জানান।

এ ঘটনার তদন্ত কমিটি প্রধান ও মিরপুর জোনের পুলিশের এডিসি জসীম উদ্দীন জানান, আমরা যে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছি তার বড় প্রমাণ হচ্ছে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। নিহতের অতীত সব কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করছি। জড়িত ব্যক্তিদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হবে। কোন ছাড়া দেয়া হবে না।

নিহতের পরিবারের কাছ থেকে তদন্ত কমিটি চাপ দিয়ে কোন তথ্য আদায় করেছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এগুলো সব নিহতের পরিবারে অপপ্রচার।  

এদিকে, এসআই জাহিদুর রহমানের বহু সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। মাত্র পাঁচ বছর আগে তিনি পুলিশের এএসআই পদে যোগ দেন। এই পাঁচ বছরে তিনি হয়েছেন বিপুল অর্থের মালিক। অথচ তিনি গরিব পরিবারের সন্তান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পল্লবী থানাধীন বাউনিয়াবাদ এলাকার ইসলামীয়া মাদরাসার পাশে চারকাটার একটি প্লটের মালিক অর্থের জাহিদুর। গত বছরের মাঝামাঝিতে তিনি ওই প্লটটি কিনেছেন। ওই প্লটের চা দোকানি রহমান জানান, এটি এক পুলিশের প্লট। মাঝে মধ্যে তিনি এই প্লটটি এসে দেখে যান। তার ভয়ে এলাকার লোকজন তটস্থ থাকে।

এছাড়াও রূপনগর থানার পাশে একটি নবনির্মিত ফ্ল্যাট ছাড়াও গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানাধীন এলাকায় বিভিন্নস্থানে তিনি প্রায় ৩০ বিঘা চাষি জমি ক্রয় করেছেন।

সূত্র জানায়, ঢাকার কাফরুল থানায় এএসআই পদে যোগ দেয়ার পর তিনি চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রতিটি মহল্লায় তিনি ব্যক্তিগত সোর্স তৈরি করেন। এতে খোদ থানার ওসি তাকে যে কোন অভিযানে পাঠাতেন এবং সংবেদনশীল মামলার তদন্ত করতে দিতেন। এতে তার চাঁদাবাজির সুযোগ আরও বেড়ে যায়। সূত্র: মানবজমিন।

ঢাকা, ১৮ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস