যুদ্ধাপরাধী মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর পালাতক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ মোঃ হাসান আলীর বিরুদ্ধে জবানবন্দি পেশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাষট্রপক্ষের ২২ তম সাক্ষি সুরাইয়া ওরফে ফসিলা(৬৫) তার জবাবনদি পেশ করেছেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের সকলেই আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল,এজন্য পাকআর্মি ও রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর নেতৃত্ত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করে লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেয়।
চেয়ারম্যান বিচারপতি এম.ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্ত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তিনি তার জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন। এসময় প্রসিকিউটর আবুল কালাম আযাদ তার জবানবন্দি গ্রহনে সাহায্য করেন।
ফসিলা জবানবন্দিতে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাড়াইল থানা সদরে পাকিস্তানী আর্মিরা এসে ক্যাম্প করে। আমাদের পরিবারের সকলেই আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল,বিধায় পাকিস্তানী আর্মিরা আসার পরে ভয়ে আমি আমার স্বামী ও মেয়ে আমার বাবার বাড়ি রায়টুটিতে যাই। আমাদের বাড়ির অন্যান্য লোকজন ভয়ে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে যায়। এর ২/৩ দিন পর আমার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায় লোকমুখে খবর পাই যে, পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর নেত্বিত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সাক্ষি বলেন, উক্ত ঘটনা শোনার তিন চারদিন পরে আমি ও আমার স্বামী আমাদের বাড়িতে ফিরে এসে দেখি তখনও আগুণ জ্বলছে। আমাদের দেখে গ্রামের অনেক লোকজন আসে। তাদের মধ্যে আবুনি নামের এক মহিলা আমাদেরকে জানায় যে, পাকিস্তানী আর্মি, রাজাকার কমান্ডার হাসান আলী দারোগার নেতৃত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। সে সময় আমাদের গোয়ালে তিনটি গরু বাঁধা ছিল। আবুনি এসে ঐ গরুগুলোকে বাঁচানোর জন্য রশিগুলো কেঁটে দেয়।
ফসিলা আরো বলেন, ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরের দিকে। আবুনির বাড়ি আমাদের বাড়ির সাথে সে আমাদেরকে জানায় যে, ঐ ঘটনা সে নিজ চোখে দেখেছে। বাড়ি ঘরের ঐ অবস্থা দেখে আমি এবং আমার স্বামী আমার বাবার বাড়িতে ফিরে আসি। দেশ স্বাধীন হলে বাড়িতে ফিরে এসে ছোট ঘর তৈরী করে আবার বসবাস শুরু করি।
সাক্ষির জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন হাসান আলীর পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান। পরে মামলার কার্য্যক্রম আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর হাসান আলীর অনুপস্থিতিতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় আব্দুস শুকুর খানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়।
গত ২৪ আগস্ট হাসান আলীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়ে পলাতক এ রাজাকার কমান্ডারকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়ার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে তাকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেয় প্রসিকিউশন।
পলাতক হাসান আলীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট, আটক ও নির্যাতনের ৬টি অভিযোগ আনা হয়। এতে ২৪ জনকে হত্যা, ১২ জনকে অপহরণ ও আটক এবং ১২৫টি ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন হাসান আলী। সে সময় তিনি তাড়াইল থানা এলাকায় ‘রাজাকারের দারোগা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তবে তিনি বর্তমানে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে না থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছিহাতা গ্রামে বসবাস করছেন বলে জানা যায়।
তবে তদন্তের স্বার্থে আনা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গত ৩ এপ্রিল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও এখনো তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
এসএইচ





