গুলশানে হামলায় নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের জড়িত থাকার ব্যাপারে 'প্রাথমিক সত্যতা' পাওয়ার দাবি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে কয়েকদিন ধরেই নানামুখী বক্তব্যে হাসনাত রেজা করিম ও কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসিব খান হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় জড়িত কি-না তা নিয়ে ধূম্রজাল বেড়েই চলছে।
সন্দেহাতীতভাবে তারা এই ঘটনায় সম্পৃক্ত কি-না তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি মামলার তদন্ত সংস্থা। রিমান্ড শেষ হলেই এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে আসা যাবে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন। এদিকে গতকাল আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তাহমিদের দুই বান্ধবী।
হামলার পর হলি আর্টিসানের ছাদের ওপর জঙ্গিদের সঙ্গে হাসনাত-তাহমিদের 'ঘনিষ্ঠ' অবস্থায় ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর থেকে শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা। মামলার তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট কয়েকদিন ধরেই বলে আসছে, এখনই তাদের বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। সর্বশেষ গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যের গ্রেফতার নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, আর্টিসানের হামলায় হাসনাত করিমের জড়িত থাকার ব্যাপারে 'প্রাথমিকভাবে সত্যতা' পাওয়া গেছে। তবে এ ব্যাপারে পরে যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্ত সংস্থার কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এখন হাসনাত করিমকে গুলশানের মামলায় আট দিনের এবং তাহমিদকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে দ্বিতীয় দফায় ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তদন্তকারী সংস্থা। এই প্রথম গুলশানের ঘটনায় দায়ের মামলায় কাউকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, 'সাধারণত যখন কোনো ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য না পেয়ে পুলিশ কাউকে বা কোনো সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেফতার করে, তখন ৫৪ ধারায় রেখে তদন্ত করা হয়। আর যদি প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।' এখানে খুব স্বাভাবিক, হাসনাতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
এ কারণেই তাকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি-না এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তথ্য-প্রমাণ না পেলে কাউকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় না। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতার দেখানোর মতো তথ্য-উপাত্ত না পেলে তাকেও গ্রেফতার দেখানো হতো না।
তদন্তের এ পর্যায়ে হাসনাত করিমের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ডিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এসেছে। তবে কোন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গুলশানের ঘটনায় হাসনাতের জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, তা পরিষ্কার করা হয়নি। তাই এই বক্তব্যে ধোঁয়াশা আরও বেড়েছে। তবে তাহমিদের বিষয়ে ডিবির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য আসেনি। আর তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট হাসনাত করিমের জড়িত থাকার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুলশান হামলার মামলাটি অত্যন্ত 'স্পর্শকাতর'। এ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত। তদন্তের মাঝে বিক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়া হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ব্যাহত হয় মামলার তদন্ত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গুলশানে হামলার পর হাসনাত ও তাহমিদের গতিবিধি ছিল সন্দেহজনক। জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের 'আলোচনা' করতেও দেখা গেছে। গত এক মাসে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তাদের বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত নিখুঁত করতে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়া এখনও হাসনাতের মোবাইল ফোনসেটের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পায়নি তদন্ত সংস্থা। ঘটনার রাতে জঙ্গিরা হোটেল আর্টিসানের ভেতরে হাসনাতসহ অন্তত ছয় জিম্মির মোবাইল ফোনসেট ব্যবহার করে যোগাযোগ রেখেছিল।
তাহমিদের দুই বান্ধবীর জবানবন্দি: গুলশানে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার প্রত?্যক্ষদর্শী তাহমিদের বান্ধবী ফায়রুজ মালিহা ও তাহানা তাসমিয়া গতকাল সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। গতকাল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ঢাকার দু'জন মহানগর হাকিমের কাছে সেই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তারা জবানবন্দি দেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ নিয়ে ১২ জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে গুলশানের ঘটনায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। আর জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন এমন ২১ জনের বক্তব্য নিয়েছে পুলিশ। তাদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেবে তদন্ত সংস্থা। জানা যায়, জবানবন্দিতে তাহমিদের দুই বান্ধবী জানায়, তারা সেদিন ইফতার করতে হলি আর্টিসানে গিয়েছিলেন। এরপরই তারা জঙ্গি হামলার মুখে পড়েন।' প্রত?্যক্ষদর্শী হিসেবে এর আগেও যারা জবানবন্দি দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁর ক্যাশিয়ার আল-আমিন চৌধুরী সিজান, কর্মী মিরাজ হোসেন, রাসেল মাসুদ, বাবুর্চি শাহিন, শাহরিয়ার, তুহিন, শিশির, ভারতীয় নাগরিক সত্য প্রকাশ এবং মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক জাপানিদের গাড়ির চালক বাসেদ সরদার। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ডিএমপি কার্যালয়ে ডেকে জঙ্গি সংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। আর্টিসানে হামলার ঘটনায় গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করেন।
এসএ/টাইম





