বিচারাধীন বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।

গত ২৫ মে এইচআরডব্লিউকে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের শো’কজ (কারণ দর্শাও) নোটিশের বিষয়ে শুনানি শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ এবং তাপস কান্তি বল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষে শুনানি করেন আসাদুজ্জামান।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর এইচআরডব্লিউ’র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে শো’কজ (কারণ দর্শাও) নোটিশ জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ৩ সপ্তাহের মধ্যে এ নোটিশের জবাব দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলেও আসামিপক্ষ কয়েকদফা আবেদন জানিয়ে সময় বাড়িয়ে নেন।
পরে গত ১০ এপ্রিল শো’কজ নোটিশের জবাব দাখিল করেন এইচআরডব্লিউ’র আইনজীবী মো. আসাদউজ্জামান।

শো’কজ নোটিশের আদেশে হিউম্যান রাউটস ওয়াচের পরিচালনা পর্ষদ, এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস ও এশীয় অঞ্চলের সহকারী স্টর্ম টিভকে বিবাদী করে নোটিশের কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিবাদীদের কাছে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের আদেশে সুনির্দিষ্ট তিনটি বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়। বিষয় তিনটি হচ্ছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার বিচার প্রক্রিয়া এবং আপিল বিভাগে বিচারাধীন দুইটি মামলার বিচার কার্যক্রম নিয়ে মনগড়া মন্তব্য করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান না করে মনগড়া ভিত্তিহীন, মিথ্যা, দূরভিসন্ধিমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিচারকদের ভূমিকা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অনৈতিকভাবে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সুনাম এবং মর্যাদাহানি করেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে গত বছরের ২০ আগস্ট আদালত অবমাননার অভিযোগটি দাখিল করেন প্রসিকিউশন।

এরপর ২২ আগস্ট অভিযোগের বিষয়ে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সুলতান মাহমুদ সীমন ও তাপস কান্তি বল।

এইচআরডব্লিউ তার বিবৃতিতে গোলাম আযমের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে ৫টি প্রশ্ন তুলে ধরেছিল। এগুলোর মধ্যে প্রথম দু’টি অর্থাৎ বিচারকরা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে তদন্ত করেছেন এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে গোপন সহযোগিতা ও পক্ষপাতের অভিযোগ তোলায় প্রসিকিউশন আদালত অবমাননার অভিযোগ দাখিল করেন। বাকি ৩টি প্রশ্ন ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয় এবং আপিল বিভাগে আপিল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত হওয়ায় সেগুলো সম্পর্কে অভিযোগ করা হয়নি।

এতে যাদেরকে বিবাদী করা হয়েছে- তারা হচ্ছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালনা পর্ষদ (৩৫০, ফিফথ অ্যাভিনিউ-৩৪তলা, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র), সংস্থার এশীয় অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস (১০০, বুশ স্ট্রিট, স্যুইট ৯২৫, সানফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র) এবং এশীয় অঞ্চলের সহকারী স্টর্ম টিভ (১৬৩০, কানেক্টিভিটি অ্যাভিনিউ, এন.ডব্লিউ, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র)।

আদালত অবমাননার অভিযোগের আবেদনের শুনানিতে ৫টি আরজি জানান প্রসিকিউশন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর ১১ (৪) ধারা অনুযায়ী কেন বিবাদীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে না, সেজন্য রুল চান তারা। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের বিচারিক বিষয়ে গত বছরের ১৬ আগস্ট সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বিশ্বব্যাপী প্রচারিত মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতদুষ্ট, অপপ্রচারমূলক বিবৃতিটি শুনানি শেষে কেন ট্রাইব্যুনালবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বলে গণ্য করা হবে না সেজন্যও রুল জারির আবেদন জানান।

পরবর্তীকালে এ ধরনের বিবৃতি বা প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশনার বিষয়েও স্থগিতাদেশ চান প্রসিকিউশন।

অন্যদিকে আদালত অবমাননার পরিপ্রেক্ষিতে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং পর্যাপ্ত জরিমানা চেয়ে বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশ জারির আবেদন জানানো হয়।

প্রসিকিউটররা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ সম্পর্কে সংস্থাটির প্রতিনিধিদের হাজির করে এ বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশনা চান। আইন অনুসারে এর উপযুক্ত ন্যায়বিচার প্রার্থনাও করেন তারা।

গোলাম আযমের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে গত বছরের ১৬ আগস্ট শুক্রবার এক বিবৃতি প্রচার করে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

‘Bangladesh: Azam Conviction Based on Flawed Proceedings’ শিরোনামের এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে বিচার-প্রক্রিয়ায় পাঁচটি ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়।

এইচআরডব্লিউ’র দৃষ্টিতে বিচার প্রক্রিয়ায় পাঁচটি ত্রুটির মধ্যে রয়েছে, বিচারকরা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে তদন্ত করেছেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে গোপন সহযোগিতা ও পক্ষপাতিত্ব, আসামিপক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তায় ব্যর্থতা, বিচারক প্যানেলে পরিবর্তন, সন্দেহাতীতভাবে দোষ প্রমাণ করতে তথ্য-প্রমাণাদির অভাব এবং সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে বিচারকদের তদন্ত করা।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক প্রধানের বিচারে গুরুতর ত্রুটি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মান রক্ষা করা হয়নি।

গত বছরের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন। বয়স বিবেচনায় ফাঁসির পরিবর্তে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২৪৩ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়েছে, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা ৫ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬১টি অভিযোগের সবক’টিই প্রমাণিত হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেছেন, গোলাম আযম মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য। তিনি সবকিছুর জন্য দায়ী। তিনি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেছিলেন। তাদের তিনি তার অনুসারীদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু সজ্ঞানে তিনি তা করেননি। তার বয়স ৯১ বছর। শুধু এই বিবেচনা করেই এ রায় দেওয়া হলো।

ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ