আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ইজারা দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও কোন ব্যাতিক্রম কিছু ঘটেনি।

গত বেশ কয়েক বছরের মত এবারও রাজধানীর সব পশুর হাট দখলে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

আর এই কাজে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছে দুই ডিসিসি’র কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

ক্ষমতাসীনদের কারসাজির সাথে তাল মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ১৬টি অস্থায়ী গবাদি পশুর হাটের টেন্ডারও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইজারা পাওয়া সবাই সরকার দলীয় নেতাকর্মী।

যে বছর যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলেরই লোকজন এক্ষেত্রে অগ্রাধীকার পায়। তারপরও এই ইজারা নিয়ে গড়ে ওঠে বেশ কিছু গ্রুপ।

কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কমপক্ষে দুই ডজন ক্যাডার গ্রুপ। পশুর হাটের টেন্ডার নেওয়ার পর এখন হাটের নিয়ন্ত্রণ, হাটে পশুবোঝাই ট্রাক, ট্রলার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনাসহ নানা কাজে প্রভাবশালীরা এসব ক্যাডার গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে থাকে।

অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেটের বাইরে কারও পক্ষে শিডিউল সংগ্রহ ও জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হাট ইজারার ক্ষেত্রে শুধু সরকারদলীয় ইজারাদারদের কাছে শিডিউল বিক্রি করা হয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন কৌশলে তারা সাধারণ মানুষকে হাট ইজারার দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করেছেন।

এক্ষেত্রে করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে শিডিউল কম বিক্রি করানো হয়েছে। ফলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে ঘুরে-ফিরে একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা কোরবানীর পশুর হাটের ইজারা পাচ্ছেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আপোষ-মীমাংসায় কম মূল্যে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে ইজারা দেয়া নেয়া হয়।

উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাসহ বড় বড় কর্মকর্তারা ডেকে এনে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের কোরবানির পশুর হাটগুলো নামমাত্র মূল্যে ইজারা দিয়ে দেন। যাতে তারা সরকারের কাছে নিজেদের আস্থাভাজন কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতে পারেন।

এছাড়া এ সময় ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের সামনে এবং আঞ্চলিক অফিসে প্রতিদিন ‘মহড়া’ দেন ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা।

এতে সকল ইজারা প্রার্থীর পক্ষে নির্বিঘ্নে দরপত্র জমা দেয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে গত বছরও কয়েক দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে সিন্ডিকেটের বাইরে কারও পক্ষে সিডিউল সংগ্রহ ও জমা দেয়া সম্ভব হয় না।

ডিএসসিসির ও ডিএনসিসির অস্থায়ী গরুর হাটগুলোর ইজারা ক্ষমতাসীনদের আয়ত্তে রাখতে সব সময়ই নেয়া হয় নানা কৌশল। এর মধ্যে একই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে-বেনামে নামমাত্র মূল্য দিয়ে দরপত্র জমা দিয়ে থাকেন।

যে কারণে নিজেদের কাঙ্খিত দামে ইজারা পেতে সহজ হয়ে যায়। এতে প্রতি বছর সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়।

মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ১৯ সেপ্টম্বর থেকে ঢাকা মহানগর এলাকার নির্ধারিত ১৬টি স্থানে কোরবানির পশুর হাট শুরু হওয়ার কথা।

তবে অভিযোগ উঠেছে, হাটের ইজারা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কিছু অসাধু লোক আছে যারা অবৈধ ভাবে হাট থেকে চাঁদা তুলে থাকে। এব্যাপারে কোন অভিযোগ করলেও তা কাজে আসেনা।

তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা, পুলিশের ভাষ্যমতে এ ধরনের অভিযোগ তাদের কাছে নেই এবং এমন চাঁদাবাজির ঘটনা তারা ঘটতে দেয় না।

এব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপ কমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, কোরাবানির হাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ এখনো পর্যন্ত আসেনি।

কোরবানির হাট শুরু হওয়ার পর যদি এমন কোন অভিযোগ আসে তবে তাদের বিরুদ্ধে আবশ্যই অ্যাকশান নেওয়া হবে।

টাইমনিউজকে তিনি আরো বলেন, কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে আমাদের অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, ওয়াচ টাওয়ার, পুলিশ কন্ট্রোল রুম, টহলরত পুলিশ থাকবে।

এছাড়াও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আমাদের সর্বোচ্চ নাজরদারি থাকবে যাতে কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি অথবা কোন অবৈধ কোন কিছু না হয়।

গরুর হাটগুলোর ইজারা ক্ষমতাসীনদের আয়ত্তে রাখতে নেয়া হয় বিভিন্ন কৌশল। তারপরও চলে বিভিন্ন ধরনের হানাহানি। কাকে ইজারা দেওয়া হবে, কে পাবে এই নিয়ে চলে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং। প্রতি বছরই এই দখল দারিত্বের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটে নানা ঘটনা।

প্রসঙ্গত, কোরবানির গুরুর হাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বাড্ডায় চার খুনের ঘটনা ঘটে। গরুর হাটের ইজারা ও চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের একপক্ষের সঙ্গে অপর পক্ষের বিরোধ চলছিল প্রায় দু’বছর ধরে।

আর সেই দখল আর আধিপত্যের জেরেই গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডায় চার খুনের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত তিনজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

এমআর/এসএইচ