আদালত চত্বরে তরুণীর শ্লীলতাহানি ও সাংবাদিক পেটানোর পর এবার ঝুট ব্যবসায়ী সুজন হত্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন মিরপুর মডেল থানার ওসি সালাউদ্দিন। প্রধান আসামি এসআই জাহিদের পাশাপাশি ওসি সালাউদ্দিনকেও জড়িয়ে মামলা দায়ের করেছেন নিহতের স্ত্রী মমতা সুলতানা লুচি।
রোববার সকালে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ জহিরুল হকের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের পর বেলা সাড়ে ১১টায় আদালত মামলাটি গ্রহণ করেন। পরে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এর আগে গত ১২ জুলাই শনিবার রাতে থানা হাজতে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনের পর মারা যান ঝুট ব্যবসায়ী সুজন। ওই ঘটনায় ওসি সালাউদ্দিন খান এবং এসআই জাহিদসহ মোট ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন- এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাজকুমার, কনস্টেবল আসাদ, রাশেদুল, ওসি সালাউদ্দিন এবং মিথুন, নাসিম, ফয়সাল, খোকন ও পলাশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুর থানার এসআই জাহিদুর রহমান ঝুট ব্যবসায়ী সুজনকে থানা হাজতে আটকে রেখে নির্যাতন করে হত্যা করেন। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন ওসি সালাউদ্দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর মডেল থানার এক এসআই টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, মামলার প্রধান আসামি এসআই জাহিদ চাঁদাবাজিতে পারদর্শী। শুধু এ কারণেই ইতোপূর্বে বিভিন্ন অপকর্মে শাস্তি পাওয়া এসআই জাহিদকে নিজ থানায় বদলি করে আনেন ওসি সালাউদ্দিন।
বিনিময়ে জাহিদ ওসি'কে মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা দিতেন। ওসির আশকারা পেয়ে জাহিদ বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু জাহিদ এখন বিপদে পড়ায় ওসিও চুপ মেরে গেছেন। সুজন হত্যাকাণ্ডে ওসির প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে জানান তিনি।
পুলিশ হেফাজতে ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান সুজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দিন খানের প্ররোচনা ছিল বলে দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরাও। তারা বলছেন, দেড় লাখ টাকা না দেয়ায় সুজনকে পিটিয়ে হত্যা করেন এসআই জাহিদুর রহমান খান।
স্ত্রী মমতা সুলতানা লুচিকে বলেন, দেড় লাখ টাকা না দিলে তার স্বামীকে মেরে ফেলা হবে। গভীর রাতে টাকা দিতে না পারায় ক্ষিপ্ত হয়ে জাহিদ তাকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন। তাকে বাঁচাতে গেলে লুচিকে চুলের মুঠো ধরে মারধর করা হয়।
নিহতের শ্যালক ওমর ফারুক হাসান লুসন বলেন, পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত মূলত এসআই জাহিদ ও আসাদ। কিন্তু ওসির নির্দেশ বা প্রশ্রয় ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। তাই তাকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মিরপুর এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ হেফাজতে নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ী ও দোষীদের বিচার হয়নি। পুলিশ হেফাজতে নিহত হওয়ার পর নিহত ব্যক্তিদের চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, চরমপন্থী দলের সদস্য ও অপরাধী বলে কার বিরুদ্ধে কতটি মামলা আছে এবং নিহত হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়ে হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিয়ে প্রকৃত দোষী ও দায়ী পুলিশ সদস্যদের আড়াল করা হচ্ছে।
মিরপুর থানা হেফাজতে সুজনকে হত্যায় অভিযুক্ত এসআই জাহিদ গত ৬ মাসে তার হেফাজতে থাকা অবস্থায় আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এই দুইটি ঘটনায় তার বিরুদ্ধের অভিযোগ পুলিশ সদর দফতর থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালেই মিরপুর থানার হাজতখানায় সুজন নামে একজন নির্মমভাবে মৃত্যুর পথযাত্রী হন।
সুজনের মৃত্যুর আগে জনি ও জাভেদ নামে দুই জন তার হেফাজতে মৃত্যু হয়। এসময় মিরপুর থানার ওসি সালাউদ্দিন খান এই দুই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেন।
নিহত সুজনের বড় ভাই নজরুল ইসলাম শামীম টাইমনিউজবিডিকে জানান, এসআই জাহিদকে পরিচালনা করেছে ওসি সালাউদ্দিন। আমার ভাই পুলিশের টর্চারে থানা হাজতে মারা গেল, অথচ পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ঘটনার পরপরই আমি থানায় মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি।
তিনি জানান, সুজন হত্যায় ওসিসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন। এরপর মামলা করার ক্ষেত্রে ওসি সালাউদ্দিন অসহযোগিতা করেছেন।
এদিকে খোদ পুলিশেই অভিযোগ উঠেছে, সুজন হত্যা মামলার আসামি পুলিশের তিন সদস্য এএসআই রাজকুমার, কনস্টেবল আনোয়ার ও রাশেদুলকে থানা থেকে পালিয়ে যেতে ওসি সহযোগিতা করেছেন।
ওসি সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও যতো অভিযোগ:
ওসি সালাউদ্দিন ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ কোতোয়ালি থানায় যোগ দেন। শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে হয়রানি, ঘুষ বাণিজ্য ও আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ গ্রেপ্তার বাণিজ্যের। নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হাজতে আটকে রেখে নির্যাতন করে অর্থ আদায়ের একাধিক অভিযোগ দেয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তরে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ৪৮টি থানার মধ্যে কোতোয়ালি থানাতেই প্রথম রেজিস্ট্রার বুক খোলা হয়। থানায় আগত সেবাপ্রার্থীদের নাম ঠিকানা লিখতে হয় রেজিস্ট্রারে। একটি বিশেষ অঞ্চলের পুলিশ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রচার করতে থাকেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, আমার বিরুদ্ধে কোথাও কোন অভিযোগ করে লাভ হবে না।
অন্যদিকে কোতোয়ালি থানার ওসি'র দায়িত্ব পালনকালে আদালত চত্বরে তরুণীর শ্লীলতাহানি ও সাংবাদিক পেটানোর ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন সালাউদ্দিন খান।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে ২০১২ সালের ১১ আগস্ট বদলি হয়ে তিনি মিরপুর থানায় আসেন। কেলেঙ্কারির কারণে অনেকটা গোপনেই মিরপুর থানায় যোগদান করে ছুটি নেন এই কর্মকর্তা।
তরুনীর শ্লীলতাহানি ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসির দায়িত্ব দেয়ায় খোদ পুলিশ বিভাগেই অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। এ যেন শাস্তির বদলে পুরস্কার।
২০১২ সালের ২৬ মে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকদের পেটানোর ঘটনায় তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনারসহ পুলিশের ৯ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। অথচ এর তিন দিন পরই আদালতপাড়ার ওই ঘটনায় সালাউদ্দিন একই রকম অপরাধকর্মে সরাসরি যোগদান করলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি উর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৯ মে বিচারপ্রার্থী এক তরুণী তার বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেলে আদালত চত্বরে গেলে পুলিশের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়।
এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা তাকে টেনে হিঁচড়ে পুলিশ ক্লাবে নিয়ে শ্লীলতাহানি করে। এ সময় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের পিটুনির শিকার হন প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের তিন সাংবাদিক।
এছাড়াও পেটানোর পর দুই আইনজীবী এবং ওই তরুণীকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। এ ঘটনার নেতৃত্ব দেন পুলিশের সহকারী কমিশনার রাজীব আল মাসুদ এবং ওসি সালাউদ্দিন খান।
এ ঘটনায় ওইদিনই এসআই নুরুজ্জামান সরকার ও আমির আফজাল বিপ্লবকে প্রত্যাহার করা হয়। পরদিন রাজীব আল মাসুদ ও সালাউদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনা তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে। পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রধান করে গঠিত অন্য দুটি কমিটির প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিটাইমনিউজবিডি'কে বলেন, বিষয়টির এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদালত বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি জানান, পুলিশও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দুই তদন্ত কমিটি আলাদা ভাবে কাজ করবে। দ্রুত এ ব্যাপার প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা, জেইউ, ২০ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





