বেসরকারী টেলিভিশন চ্যালেন আই এর ইসলামীক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও ইসলামী ফ্রন্টের নেতা মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ। তার পরও তদন্ত কাজ শেষ হয়নি। চলছে তদন্ত মন্থর গতিতে। থানা থেকে ডিবি সেখান থেকে সিআইডি এমন বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে মামলার তদন্ত।
এ ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)। তাই মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য নেওয়া হচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। তবে পরিবারের দাবি মামলাটি ডিবিতে থাক আর সিআইডিতে থাক। মামলাটি যেন সঠিক প্রক্রিয়ায় হয় এবং সুষ্ঠ ও সঠিক বিচার হয়।
তবে মাওলানা ফারুকীর পরিবার অভিযোগ করে বলছে, তাদের দেওয়া কোন তথ্য বা কোন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম আমলে নিচ্ছে না ডিবি।
গত বছরের ২৭ আগস্ট পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন ফারুকী। এ ঘটনায় শেরে বাংলানগর থানায় একটি ডাকাতি ও হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়া মাওলানা তারিক মনোয়ারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করেন ইসলামী ফ্রন্টের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সেনা।
শেরে বাংলানগর থানায় দায়ের মামলাটি কয়েকদিন পরই অধিকতর তদন্তের জন্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানন্তর করা হয়। দীর্ঘ এক বছরের তদন্তে তেমন সাফল্য না পেয়ে ডিবি মামলাটি এখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে ফারুকীর হত্যার এক বছর পার হলেও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করেছিল ডিবি। তাদের রিমান্ডেও আনা হয়েছিল। কিন্তু তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগের এপ্লিকেশন সার্ভিসের কথোপকথন ট্র্যাকিং কিংবা অবস্থান ট্র্যাক করার কোন প্রযুক্তি তাদের নেই। এ সকল মাধ্যমে যোগাযোগের কারণে গোয়েন্দারা তাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে পারছে না।
কল ট্র্যাকিং, ফেসবুক, ভাইবার, টুইটারের বার্তা নিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টগুলোর অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই। আর সেই লক্ষে মামলটি অধিকতর তদন্তের জন্যে সিআইডিতে নেওয়া হবে।
ঘটনার সময় বাড়িতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত পুলিশের কাছ থেকে ডিবিতে হস্তান্তরের পর ‘ফারুকী ইসলামিক ফ্রন্টের নেতা, তার হজ এজেন্সির ব্যবসা ছিল এবং পারিবারিক জীবনে তার দুই স্ত্রী রয়েছে’ এমন সম্ভাব্য তিন কারণকে প্রাধান্য দিয়ে তদন্ত শুরু করে।
ডিবি শুধু জানিয়েছে, ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধীতার জের ধরে এ হত্যাকান্ডটি সংঘঠিত হয়। ফারুকীর মতাদর্শের বিরোধী উগ্রপন্থিরা এ হত্যাকান্ড ঘটায়। তবে এই উগ্রপন্থিদের কাউকে আজও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তের এমন ধীরগতি হওয়ায় নিহত ফারুকীর ছোট ছেলে ফুয়াদ ফারুকী অভিযোগ করে টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সব মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়। কিন্তু এ মামলার অগ্রগতি তো দূরের কথা এক বছর আগে যে আশ্বাস দিয়েছিল এখনো সেই আশ্বাসের মধ্যেই স্বীমাবদ্ধ রয়েছে।
নুরুল ইসলাম ফারুকীর সহকারী আব্দুল মোমিনের ব্যাপারে তার পরিবারের একটা অভিযোগ ছিল। এই হত্যাকান্ডের সাথে মোমিন জড়িত বলে তাদের ধারণা।
কারণ হিসেবে তার স্বজনেরা বলছে, এই হত্যাকান্ড সংঘঠীত হওয়ার এক সপ্তাহ আগে মোমিন কাউকে কিছু না বলে লাপাত্তা হয়ে যায়। তার বাড়ি বগুড়ায়। তার সাত থেকে আটটা মোবাইল নম্বর রয়েছে। কিন্তু একটাও রিসিভ করে না। এটা অবশ্যই সন্দেহ জনক।
আমরা তার সকল ঠিকানা তথ্য এমনকি তার মায়ের মোবাইল নম্বরও ডিবির কাছে দিয়েছি। তারপরও তাকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদের কোন ব্যাবস্থা করা হচ্ছে না।
ফুয়াদ ফারুকী বলেন, 'মামলার তদন্তের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আমাদেরকে ধমক দেওয়া হয়। তারা বলেছিল কাউকে সন্দেহ হলে বা কোন তথ্য পাইলে তাদেরকে জানাতে। কিন্তু আমাদের সন্দেহ হয় এমন কাউকে ধরতে বললে তারা বলে আপনারা ধরেন।'
পারিবারিক, ব্যবসায়িক কিংবা ডাকাতির ঘটনায় তাকে খুন করা হয়নি। তিনি সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। হত্যার আগে তাকে তার মতাদর্শের বিরোধীরা মোবাইল ফোন ও ফেসবুকে হত্যার হুমকি দিত। উগ্রপন্থীরা পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে বলে ফারুকীর স্বজনরা বরাবরই একই দাবি করছেন। তাছাড়া সকল ধরনের তথ্য দিয়েও তারা মামলার তদন্ত কাজে সহায়তা করছেন।
ফারুকীর বড় ছেলে আহমদ রেজা ফারুকী অভিযোগ করে টাইমনিউজবিডিকে বলেন, অন্য সকল মামলা দ্রুততার সাথে তদন্ত হচ্ছে কিন্তু আমাদেরটা হচ্ছে না কেন। যতদিনই লাগুক এটার যেন বিচার হয়। তবে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক বিচার চাই।
মামলা ডিবিতে যাক আর সিআইডিতে যাক মামলাটি যেন অন্যদিকে প্রবাহিত না হয় এমন অনুরোধ রেখে তিনি বলেন, আমার বাবাকে ধর্মীয় উগ্রপন্থিরাই হত্যা করেছে। এটি একটি হত্যা মামলা। তাই এটাকে ডাকাতি, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক কোন্দলে না সাজানো হয়।
সর্বশেষ গত বছরের ৮ নভেম্বর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে মোজাফফর বিন মহসীন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। ডিবি দাবি করে, মোজাফফর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অন্যতম নেতা। মাওলানা ফারুকী খুনের কয়েকদিন আগে সে ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রচার করেছিল।
হত্যাকাণ্ডে প্ররচনাদানকারী হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময় ফারুকীর বক্তব্যের বিরুদ্ধাচরণ করে হুমকি দিয়েছেন। ওই ভিডিওতে মাওলানা ফারুকী শিরক করছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন মোজাফফর। তিনি পিস টিভির একজন বক্তা এবং আহলে হাদিসের সাবেক সভাপতি।
বুধবার মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে ফারুকীর বড় ছেলে আহমদ রেজা ফারুকীর এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দের সাথে বার বার ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পশ্চিম বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) সাজ্জাদ হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, এখনো হস্তান্তর করা হয়নি মামলাটি ডিবিতেই আছে। সিআইডিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এখনো অর্ডার (আদেশ) আসে নাই। অর্ডার আসলে দু’একদিনের মধ্যেই হস্তান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, মামলার তদন্তে উগ্রপন্থি কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্যে সিআইডিতে স্থানান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর ১৭৪ পূর্ব রাজাবাজারে সন্ধ্যায় নিজ বাসায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপক শায়খ মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারকীকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামিক মিডিয়া জনকল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান ও ফারকী ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।
এএইচ/এআই





