সহজে ভিসাপ্রাপ্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঠিক নজরদারির অভাবে বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। ব্যবসায়ী, ছাত্র ও ভ্রমণ ভিসায় ইউরোপ-আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা আসছেন। কিন্তু তাদের অনেকে অপরাধপ্রবণ হলেও নেই সঠিক নজরদারি।
তাদের বাংলাদেশে আসার মূল টার্গেট হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত করা। সম্প্রতি বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসা, বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রা তৈরি, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, টার্গেট কিলিং, ডলার প্রতারণাসহ নানা অপরাধে বিদেশি নাগরিকদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
অপরাধে জড়িয়ে পড়া বিদেশি নাগরিকদের বেশির ভাগই আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের অধিবাসী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, অপরাধে জড়িয়ে পড়া ভিনদেশি নাগরিকরা বেশির ভাগই ভ্রমণ, খেলোয়াড়, মানবাধিকার কর্মীসহ নানা পরিচয় দিয়ে দেশে ঢুকছে। কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা ফিরে যাচ্ছে না।
শুধু তাই নয় দেশেও রয়েছে ভিনদেশি এই অপরাধী চক্রের সক্রিয় এজেন্ট। তাদের মাধ্যমেই তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত অবৈধ নাগরিকদের বিরুদ্ধে খোঁজখবর নেয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি রয়েছে। ঢাকায় বর্তমানে কত জন বিদেশি নাগরিক বসবাস করছে এ বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই তাদের হাতে। যদিও ইমিগ্রেশন পুলিশের দাবি, আগত বিদেশিদের তথ্যবহুল ডাটাবেজ রয়েছে তাদের কাছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর অভিজাতপাড়ায় ও আগত বিদেশি নাগরিকদের উপর গোয়েন্দা নজরদারি কম। সে কারণ তাদের দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
সম্প্রতি নানা অপরাধকর্মে বিদেশী নাগরিকদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সম্প্রতি ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করা অভিযোগে আটক করে ডিবি পুলিশ। এ ঘটনার পর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, বাংলাদেশে ৫ সহস্রাধিক বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে বসবাস করছে। খুব শিগগির তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসায় মাত্রাতিরিক্ত মাদকসেবন করে মারামারি ও ভাংচুরের ঘটনায় ১৯ আফ্রিকানকে আটক করে পুলিশ। জব্দ করা হয় জাল ইউএস ডলার, ডলার তৈরির সরঞ্জাম, হেরোইন, কোকেন ও অবৈধ পাসপোর্ট।
জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা মাদক ব্যবসা, পাচার ও জাল ডলার তৈরি করে বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
একই বছর বনানীর ওয়েস্টিন হোটেলে বেতসী নামে এক আফ্রিকান মহিলা কোকেনের পাঁচটি বারসহ গ্রেফতার হয়। ওই নারী কোকেনের বারগুলো খেয়ে পেটে করে বাংলাদেশে এসেছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
একই বছরের অক্টোবরে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ডিবির অভিযানে গ্রেফতার হন লিবিয়ার নাগরিক সামির আহম্মেদ ওমর ফর্ড, আমারা মাহমুদ আমারা ও মাবুর্ক ফর্ড সাইলেম। সে সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৬৮৪ বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ১১ লাখ টাকা, প্রায় ২ লাখ টাকার সমপরিমাণ ইউএস ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, মাদকদ্রব্য ও মাদ্রক ব্যবহারের সরঞ্জাম।
২০১৩ সালে রাজধানীর উত্তরায় ভিওআইপি সরাঞ্জমসহ তাইওয়ানের ৩২ এবং চীনের ৫ জন নাগরিকসহ মোট ৩৭ বিদেশিকে আটক করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
২০১৩ সালের ২ অক্টোবর উত্তরা ৩ নম্বরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অ্যাফিড্রিনযুক্ত ওষুধ, ওষুধ তৈরির মেশিন, মদ, পাসপোর্ট, টাকা, ইউএস ডলারসহ ৭ চীনা নাগরিক ও তিন বাংলাদেশি সহযোগীকে আটক করে র্যাব।
এরপর ১৯ জুন উত্তরায় নাইজেরিয়ান এক নাগরিকসহ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানচক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার কেরে র্যা ব। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘ডিএইচএল’ এর মাধ্যমে তারা হেরোইনের একটি বড় চালান চীনে পাচারের চেষ্টা করছিল বলে সে সময় অভিযোগ উঠে। এর আগে কোকেনসহ আটক করা হয় পেরুর নাগরিক হুয়ান পাবলো রাফায়েল জাগাজিটাকে।
২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারী রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমি এলাকা থেকে তেহরিক ই-তালেবানের ৩ সদস্যকে আটক করে ডিবি পুলিশ। ২১ জানুয়ারি উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জাল ডলার তৈরির অভিযোগে ২ মহিলাসহ ৩ আফ্রিকান নাগরিককে আটক করে ডিবি পুলিশ।
গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে জুবায়ের আহমেদ (১৭) নামের স্কুল ছাত্র খুন হয়। খুনের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে আলজেরিয়ার নাগরিক আবু ওবায়েত কাদেরকে (৪৬) গ্রেফতার করে পুলিশ। সে সেময় তার কাছ থেকে কোনো পাসপোর্ট ও ভিসা পায় নি পুলিশ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতভর রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার ১৪৭টি বাসায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে অবস্থানরত ৩১ জন নাগরিককে আটক করে ডিবি পুলিশ।
পরে প্রয়োজনীর কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করে ৬ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। আটককৃতদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ আইনের ১৪/১১/ক/খ-ধারা অনুযায়ী উত্তরা পশ্চিমে ৬, রামপুরায় ২ এবং গুলশান থানায় ১টিসহ মোট ৯টি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এদের মধ্যে গুলশান থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তিন উগান্ডা ও এক নাইজেরিয়ান নাগরিককে ২ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের (পশ্চিম) উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, অপরাধকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ পাওয়ায় বিদেশি নাগরিকরা কোথায় বসবাস করছেন তা খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে অবৈধ নাগরিকদের কাছে বাসা ভাড়া যেন দেয়া না হয় সেজন্য বাড়িওয়ালাদের সতর্ক করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা যোগাযোগ করা হলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) কৃঞ্চ পদ রায় টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ৩১ বিদেশি নাগরিকের মধ্যে প্রয়োজনীর কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করে ৬ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ২৫ জনের বিরুদ্ধে ফরেন অ্যাক্ট-এ মামলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হতে পারে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে মূলত বিদেশি নাগরিকরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এসব ভিআইপি এলাকায় স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের বন্ধুত্বের ফাঁদে ফেলে নানা অপরাধকর্ম সংঘটিত করে আসছিল তারা। বিদেশি নাগরিকদের তালিকা করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টধারী বিদেশি নাগরিকদের ধরতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি। ঢাকায় বসবাসরত কোন কোন বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তা তথ্য চেয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. জিয়া রহমান বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী কম থাকায় বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এই অপরাধ প্রবণতারোধে বিদেশি নাগরিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা, ইমিগ্রেশন সিস্টেমকে আরো আধুনিক করার পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মত দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা করার কথা বলে বিদেশ থেকে প্রচুর লোক আসেন। অনেকে আসেন স্টুডেন্ট ও ট্যুরিস্ট ভিসায়। কিন্তু বিশেষ নজরদারি না থাকায় অপরাধী প্রবণতা নিয়েই বাংলাদেশে আসছেন বিদেশিরা।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ইমিগ্রেশন পুলিশের ওসি আব্দুস সালাম বলেন, বিদেশিদের পাসপোর্ট ও ভিসা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অনুমোদন করেন সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস। আমরা শুধু দেখি সব ডকুমেন্ট ঠিক আছে কি না। কোনো বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হলে জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়।
জেইউ, এমএ





