রাস্তার পাশেই ছয়তলা ভবনটি। ভবনের দ্বিতীয় তলার ঠিক ডান পাশেই আসবাবপত্র বিহীন একটি ফ্লাট। দরজা খুলতেই প্রথমেই ডাইনিং স্পেস। এর ডান পাশে গোসলখানা। বিপরীতে রান্না ঘর। তিন কক্ষ বিশিষ্ট ফ্লাটটির খাবার কক্ষেই দেখা যায় একটি কাঠের আলনা। তবে কোনো কাপড় নেই।

রান্নাঘরে দেখতে পাওয়া যায় ছোটছোট হাড়িপাতিল। চুলা থাকলেও সম্প্রতি রান্নার কোনো নমুনা লক্ষ্য করা যায় না। শয়ন কক্ষ দু'টির একটি বলা যায় পুরো ফাকা। তবে ফ্রিজের পুরনো একটি কার্টুন পড়ে থাকতে দেখা যায়। পাশের শোয়ার কক্ষের কাঠের চৌকির নীচে পুরুষ ও নারীর ‍দুটি প্রাণহীন দেহ।

পাশেই দুটি শিশুর হাত-পা এবং মুখ বাধা লাশ। কম্বল দিয়ে মোড়ানো। লাশে শরীরে পচন ধরার দশা। হারিয়েছে আকৃতি। মেঝেতে রক্তের দাগ। পুরো ফ্লাট জুড়ে উৎকট গন্ধ। কোনো কক্ষেই নেই বাতি এবং নেই ফ্যানও। যে কেউ প্রথমে দেখাতেই ভাববে বাসায় কেউ থাকে না।

কিন্তু দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ অর্ন্তগত তেঘুলিয়া ইউনিয়নের আছিয়া গার্ডেন সিটি এলাকার এমনি এক বাসা থেকে দুই শিশুসহ এক নারী ও এক পুরুষের লাশ উদ্ধার করেছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ।

নিহত পুরুষের বয়স আনুমানিক ৩৫, নারীর ২৫, শিশু ছেলেটির ৬ এবং মেয়েটির দুই বছর বয়সী। এ ঘটনায় সোহেল ও আক্কাস নামে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে লাশ উদ্ধারের দ্বিতীয় দিনেও তাদের পরিচয় খুঁজে পায়নি পুলিশ।

পুলিশের দাবি পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে তাদের। হত্যার কাজ সম্পন্ন করে সুযোগ বুঝে সটকে পড়েছে হত্যাকারীরা। তবে বুধবার দিনগত রাত সাড়ে বারোটার খবর পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে নি ঢাকা জেলা পুলিশ। তবে নিহতের গ্রামের বাড়ি যে বিক্রমপুরে সে ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ১১টার দিকে খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে পৌছায়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন দল আলামত সংগ্রহ করে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জামাল উদ্দিন মীর টাইমনিউজবিডিকে জানান, স্থানীয় তেঘুলিয়া ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর বাবুল দেওয়ানের ক্ষুদে বার্তায় ৪ খুনের ঘটনা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন।

তিনি জানান, সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, ছয়তলা বিশিষ্ট বাড়িটির মালিক শামসুল মিয়া। তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থাকেন। মালিকের অবর্তমানে সোহেল নামে এক তরুণ বাড়িটির দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে।

খুনের ঘটনায় কিছু জানে কিনা বা যারা নিহত হয়েছে তাদের পরিচয় জানতে কেয়ারটেকার সোহেলকে আটক করা হয়েছে। এই ঘটনায় সিএনজি চালক আক্কাসকেও আটক করা হয়েছে। কারণ আক্কাস নিহতের বাড়িটি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিআইডি’র পরিদর্শক মো. শাহ আলম মিয়া জানান, হত্যাকারীরা নিহতদের পূর্ব পরিচিত। ‘৬/৭ জনের একটি গ্রুপ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা।’

তিনি জানান, বাসা থেকে আলামত হিসেবে ইয়াবা সেবনের জন্য বিশ টাকার নোট দিয়ে বানোনো তিনটি সরু পাইপ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে হত্যার আগে হত্যাকারীরা মাদক সেবন করেছিল।

একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স, একটি জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, একটি মানিব্যাগ, একটি বেল্ট এবং মোবাইলে ভাঙ্গাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে সাজু আহম্মেদ, পিতা: প্রবীর উল্লাহ, তালাপুর, কেরানীগঞ্জ লেখা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রটি মমিনুল ইসলাম, ডোমার, নীলফামারীর ঠিকানা রয়েছে।

ছয়তলা ভবনের নিচ তলার রাস্তার পাশে দুটি মুদি দোকান। সেখানে কথা হয় মুদি দোকানী নাজমা বেগমের সাথে। তিনি প্রথমে ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন।

পরে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানান, বাড়ির কেয়ারটেকার সোহেল তিনদিন আগে মাসের বকেয়া ভাড়া নিতে এসেছিল। পরপর দু’দিন এসে দেখে বাসা বাইর থেকে তালা দেয়া দেখতে পেয়ে সোহেল রাতের বেলা আমারে জানায়, দোতলার কেউ আসলে যেন আমি ওরে জানাই। এই দু’দিনে আমার চোখে এমন কাউকে পড়েনি।

আজ (বুধবার) সকালে দ্বিতীয় তলার ওই ফ্ল্যাটে ঢোকে সোহেল। ফ্ল্যাটে এসে দেখতে পায় বাহির থেকে ছিটকানী লাগানো। উপরে চাবিসহ তালা ঝুলছে। ছিটকানী খুলে ভিতরে ঢুকতেই উৎকট গন্ধ।নাক চেপে ভিতরে গিয়ে লাশ দেখে চিৎকার দেয়। বাইরে এসে চিৎকার চেচামেচি। এরপর বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, দু’মাস আগে আব্দুল্লাহপুরের কলাকান্দি এলাকার ৬ তলা বাসার দ্বিতীয় তলা ভাড়া নেয় রফিক নামে এক লোক। সে এলাকার সিএনজি চালক আক্কাসের মাধ্যমে বাড়ির কেয়ারটেকার সোহেলের কাছ থেকে ফ্লাটটি ভাড়া নেয়। মাসিক ভাড়া ঠিক হয় ৫ হাজার টাকা।

একই পরিবারের ৭ জন ওই বাসায় থাকবেন বলে রফিক কেয়ারটেকার সোহেলকে জানিয়েছিল। তার মধ্যে রফিকের খালা-খালুসহ ৩ জন পুরুষ, দু’জন নারী এবং দু’টি বাচ্চা থাকবে।

রফিকের বরাত দিয়ে কেয়ারটেকার সোহেল পুলিশকে জানিয়েছে, ভাড়াটিয়া পুরুষ সদস্যরা নিজেদের কাঁচামালের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। তারা আব্দুল্লাহপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাজারে কাঁচামালের ব্যবসা করেন।

দ্বিতীয় তলার পাশের ফ্লাটের ভাড়াটিয়া পাপিয়া আক্তার জানান, ফেব্রুয়ারিতে তারা এই বাসায় এসেছেন। আর নিহতেরা দু’মাস আগে পাশের ফ্লাটটি ভাড়া নেয়। তবে বেশীর ভাগ সময় তাদের বাসাটি তালাবদ্ধ থাকত। তারা কারো সঙ্গেই কথা বলত না। তাদের বাচ্চারাও বাসার বাইরে খেলতে আসত না। বাচ্চাদের নামও তিনি জানেন না।

লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে আসা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই মনিরুজ্জামান জানান, লাশের শরীরে কোনো আঘাত পাওয়া যায়নি। তাদের প্রত্যেকের হাত, পা এবং মুখ বাধা পাওয়া গেছে। মনে হয় শ্বাসরোধ তরে হত্যা করা হয়ছে।

লাশ থেকে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে এসআই মনিরুজ্জামান বলেন, খুনের ঘটনায় সম্ভবত তিন চারদিন আগের। ময়নাতদন্তে এবিষয় সঠিক তথ্য জানা যাবে।

এব্যাপারে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১০) এর এএসপি সাজ্জাদ হোসেন টাইমনিউজবিডিকে জানান, খুনের ঘটনার খবর পেয়েই তারা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌছেন। লাশের অবস্থা দেখার পর তিনি জানান, নিসন্দেহে পরিকল্পিত খুনের ঘটনা এটি। আর খুন করা হয়েছে আরও ২/৩ দিন পূর্বে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও ঘটনাটি খতিয়ে দেখবে বলে জানান তিনি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান বুধবার বিকালে সাংবাদিকদের বলেন, খুনের ঘটনাটি পরিকল্পিত। খুনিরা ঠান্ডা মাথায় বাসায় ঢুকে মুখ ও হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করে পরিবারটিকে। খুনিদের ধরতে বাসা থেকে যথেষ্ট আলামত পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী ঘটনা তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। তেবে নিহতদের পরিচয় এখনো মেলেনি।

সর্বশেষ বুধবার দিনগত রাত সাড়ে বারোটায় কথা হয় ঢাকা জেলার এডিশনাল এসপি মোনালিসা বেগমের সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডিকে জানান, এখনো নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

পাশাপাশি খুনিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। খুনের ঘটনায় স্থানীয় কোনো কিলার গ্রুপ জড়িত রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিচয় জানা গেলে খুনের রহস্য ও খুনিদের খুজে বের করা সহজ হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা, জেইউ, ২৫ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর