যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন থেকে বছরে প্রায় শতকোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। চলন্ত ট্রেন, ইঞ্জিন, পাওয়ার কার এবং লোকো শেড থেকে এ চুরির ঘটনা ঘটছে।
দেশের ৬০টির বেশি স্পটে শতাধিক সিন্ডিকেট এ কাজের সঙ্গে জড়িত। ট্রেনের অসাধু চালক, গার্ড, লোকো শেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে চিহ্নিত অপরাধীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ সিন্ডিকেট।
এদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে থানায় সহস্রাধিক মামলা আছে। কিন্তু অপরাধীর অধিকাংশই গ্রেফতার হয়নি। যারা গ্রেফতার হয়েছে তারাও জামিনে বেরিয়ে এসেছে। এখন পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রের প্রধানকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
তেল চুরির ঘটনা স্বীকার করেন রেলপথ সচিব মো. ফিরোজ সালাহ উদ্দিনবলেন, ‘ যেসব জায়গায় চুরি হচ্ছে সেই স্পটগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। চুরি রোধে চিহ্নিত স্থানগুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
ইতিমধ্যে কিছু জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেনের ইঞ্জিনেও সিসি ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’ তেল চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
জানা গেছে, সারা দেশে প্রতিদিন ৩৩৭টি ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার ডিজেল খরচ হয়। এ হিসাবে বছরে ব্যয় হয় ৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার লিটার। কোনো কোনো বছর এর চেয়ে কম-বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবহৃত তেল থেকে বছরে চুরি হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি লিটার।
যার বাজারমূল্য ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা (এক লিটার ৬৫ টাকা হিসাবে)। গড়ে প্রতিদিন চুরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার লিটার। এর মধ্যে শুধু ইঞ্জিন ও পাওয়ার কার থেকে দিনে ২০ হাজার লিটার, ১১টি লোকো শেড থেকে প্রায় ১৫ হাজার লিটার এবং চলন্ত ট্রেন থেকে ৫ হাজার লিটার তেল চুরি হচ্ছে। এ ছাড়া বছরে প্রায় ১ কোটি টাকার মবিলও চুরি হয়।
তেলের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে চুরি অর্থ নির্ধারণ হয়। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে এর ভাগ চলে যায়। বিভিন্ন স্পটে সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রেনের চালক, গার্ডসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে চুরির বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কখনও কখনও ট্রেনচালক ও গার্ডদের জিম্মি করেও তেল চুরি হচ্ছে বলে তারা জানান।
ট্রেনের অসাধু চালক, গার্ড, লোকো শেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া তেল চুরি সম্ভব নয় বলে মনে করেন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম। তিনি টাইম নিউজকে বলেন, এ ধরনের চুরির ঘটনায় বহু মামলা হয়েছে। চুরির সময় সরঞ্জামসহ বহু চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অনেকেই জামিনে বের হয়ে ফের তেল চুরি করছে। তিনি বলেন, মালবাহী ট্রেনে রেলওয়ে পুলিশ থাকে না। ট্রেনচালক, গার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী সৎ না হলে তেল চুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
চলন্ত অবস্থায় ট্রেন থেকে চুরির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিন কিংবা পাওয়ার কারে পুলিশ দেয়া সম্ভব নয়।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইম নিউজকে বলেন, একই দূরত্বে যাতায়াত করলেও সব ট্রেনে একই পরিমাণ তেলের প্রয়োজন হয় না। একেক ট্রেনে খরচ হয় একেক রকম। কোনো ট্রেনে প্রতি কিলোমিটারে আড়াই থেকে তিন লিটার, আবার কোনো ট্রেনে ৫ থেকে ৭ লিটার তেল খরচ হয়।
কিন্তু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হিসাবের সময় সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় এমন একটি ইঞ্জিনকে একক ধরে মোট চাহিদা নিরূপণ করে। ফলে চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। অতিরিক্ত তেল চুরি হয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে কোনো হিসাবই থাকছে না।
উদাহরণ হিসেবে এ কর্মকর্তা বলেন, পুরনো একটি ইঞ্জিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১৮শ’ লিটার তেল খরচ হয়। নতুন ইঞ্জিনে খরচ হয় ৯শ’ থেকে ১ হাজার লিটার। পূর্বাঞ্চলের চেয়ে পশ্চিমাঞ্চলে চুরি বেশি হয়।
পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান জানান, এ ধরনের ঘটনা রোধে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই মাঠে থাকলেও চুরি রোধ করা যাচ্ছে না। কখনও চোর আবার কখনও ট্রেনচালক ও গার্ডদের আটক করা হলেও বর্তমানে চালক, গার্ড ও চোরাকারবারির সমন্বয়ে অভিনব কায়দায় তেল চুরি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলের জালানীহাট, পাহাড়তলী, পোর্ট ইয়ার্ড, বটতলী, বারতাকিয়া, গুণবতী, লাকসাম, চাঁদপুর, আখাউড়া, ইমামবাড়ী, শশীদল, শ্রীনিধি, শায়েস্তাগঞ্জ, আড়িখোলা, সুতাং, সিলেট লোকো শেড, ময়মনসিংয়ের ওভারব্রিজের নিচে, গৌরীপুর, জামালপুর,
তারাকান্দি, দেওয়ানগঞ্জ, কেওয়টখালী, কুলাউড়া স্পটে ট্রেন থামিয়ে তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। পশ্চিমাঞ্চলের শান্তাহার, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট, রোহনপুর, নাটোর, জয়পুরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রাজবাড়ী, যশোর, ডোমার, চিলহাটি, দর্শনা জং, পীরগাছা, আত্রাই, আক্কেলপুর, পাঁচবিবি, হিলি, পাকশী, আমনুরাসহ আর অন্তত ১৫টি স্টেশনের আউটারে তেল চুরি হচ্ছে।
এ ছাড়া চলন্ত ট্রেনের পাওয়ার কার, ইঞ্জিন থেকে নিয়মিতভাবে তেল চুরি হচ্ছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা তেল নিয়ে ড্রাম বা বিশেষ ধরনের ব্যাগে জমা করে। উভয় অঞ্চলে চলন্ত ট্রেনের গতি কমিয়ে দ্রুত তেলের ড্রাম বা বিশেষ ধরনের ব্যাগ নামিয়ে দেয়া হয়।
গত ৩০ নভেম্বর গাজীপুর কালীগঞ্জ আড়িখোলা রেলস্টেশন এলাকায় রাত ১০টার দিকে মালবাহী একটি ট্রেনের চালককে পিটিয়ে তেল লুট করা হয়। ওই রাতে চালককে জিম্মি করে ৭-৮ জন দুর্বৃত্ত দেশী অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে আঘাত করে। একপর্যায়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রায় ৫শ’ লিটার তেল লুট করে নেয়। পরে চালক পালিয়ে স্টেশন মাস্টারকে বিষয়টি অবগত করেন।
এ বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে। এদিকে নরসিংদী-ভৈরব রেলস্টেশনের মধ্যে অন্তত ৫টি স্থানে তেল চুরি হয়। রায়পুরা শ্রীনিধি রেলস্টেশন আউটারের রেলব্রিজসংলগ্ন মাজার এলাকায় স্বাধীনতার পর থেকেই তেল চুরি হচ্ছে। লাইনের দু’পাশে বিশাল বিল, নেই কোনো বাড়িঘর। লাইনের পশ্চিম পাশেই (১০ ফুট দূরত্ব) জনৈক এক পীরের মাজার।
বড় বড় দুটি তুলাগাছ, লাইনের দু’পাশে জঙ্গল। এলাকাটিতে ঢুকতেই ডিজেলের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। লাইন ঘেঁষা জঙ্গলের ভেতরে সারি সারি ড্রাম, পাইপ, দেশীয় অস্ত্র সাজানো। তেলচোর সিন্ডিকেটের সদস্যরাই এ মাজারটি পরিচালনা করে বলে জানা গেছে।
ওই মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লাইনের পশ্চিম পাশে মাটিতে ডিজেল পড়ে আছে। মাজারসংলগ্ন ঝুপড়ি ঘর এবং লাইনসংলগ্ন জঙ্গলে ড্রামের পর ড্রামভর্তি ডিজেল। ছদ্মবেশে ওখানে গিয়ে কথা হয়, মাজারে থাকা চণ্ডি হাশেম ও বিল্লাল পাগলার সঙ্গে। তারা নিজেদের এ নামেই পরিচয় দেন।
বলেন, জান থাকতে চলে যান। কিছুক্ষণ পরই ট্রেন আসবে, তখন জানু ভাইসহ ৭-৮ জন আসবে। পায়ের নিচে পিষে মেরে ফেলবে। এখানে সাংবাদিক, পুলিশ, রেলওয়ে কর্মকর্তা কেউ আসার সাহস পায় না। সবাইকে টাকা দিয়েই এ কাজ করা হয়।
এ সময় ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি করা তেলভর্তি ড্রামের ছবি তুলতে গেলে তারা বাধা দেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘আমরা চলে যাচ্ছি, ছবি তুলে দূরে পালিয়ে যান।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীনিধি রেলস্টেশনসংলগ্ন একাধিক বাসিন্দা জানান, শ্রীনিধি এলাকাটি মানুষ বাঁকা চোখে দেখে শুধু তেলচোরদের জন্য। এখানে ৩টি সিন্ডিকেট আছে। জানু মিয়া একটি সিন্ডিকেটের প্রধান। তার রয়েছে ৮-১০ জন সদস্য।
অপর সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করে রমজান এবং চান্দেরকান্দি গ্রামের সোহরাব হোসেন। প্রতিদিন মালাবাহী ট্রেনসহ যাত্রীবাহী বিভিন্ন ট্রেন থেকে অন্তত ৪০-৫০ ড্রাম নামে। আমির হোসেন, আলকাছ, সুলতান মিয়া, আবদুল মান্নান, সুজন, বিল্লাল, তাহেরসহ ৭-৮ জন কুখ্যাত চোরাকারবারি হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাদের সামনে কেউ ভয়ে কথা বলে না। তারা বংশগতই চুরির সঙ্গে জড়িত।
ভৈরব রেলওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল একটি সিন্ডিকেটের প্রধান সোহরাবসহ ৫ তেলচোরকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে তারা জামিনে বের হয়ে আসে। এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. আবদুল মুজিদ জানান, এ পথে তেল চুরি সিন্ডিকেটের মধ্যে এখন প্রধান হচ্ছে জানু মিয়া। জানু মিয়াকে গ্রেফতার করতে বারবার অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু সে পালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জানু মিয়াসহ অত্যন্ত ১৫-২০ জন তেলচোরের নাম এ থানায় রয়েছে। চোরাকারবারিরা ট্রেনের চালক ও গার্ডদের সঙ্গে মোবাইল, কখনও বিশেষ ইশারায় যত্রতত্র ট্রেন দাঁড় করিয়ে ডিজেল চুরি করে। তিনি বলেন, মানুষ সচেতন না হলে এ ধরনের কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে ইশ্বরদী রেলস্টেশন আউটারে ডিজেল চুরি হচ্ছে।
অসাধু স্টেশন মাস্টার, স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে অনেকেই তেল চুরির সঙ্গে জড়িত। ইশ্বরদী স্টেশনের ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম জানান, শুধু আউটারেই নয়, এখন ট্রেনের ইঞ্জিন ও পাওয়ার কার থেকেও তেল নামানো হয়। স্টেশনে প্রকাশ্যেই ডিজেলভর্তি ড্রাম নামানো হয়। অপর এক ব্যবসায়ী জানান, ইশ্বরদী এলাকায় ৩টি স্থানে জ্বালানি চুরি হয়।
চলতি বছরের ২৪ জুলাই চলন্ত অবস্থায় দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরির প্রস্তুতিকালে এলাকার চিহ্নিত চোর রাকিবুল ইসলাম ও বাঁধনকে গ্রেফতার করা হয়।
রেলওয়ের অপারেশন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, জামালপুর নান্দিনা রেলস্টেশন আউটারে তেল চুরি সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। তারা রেলওয়ে কর্মকর্তাদেরও ভয়ভীতি দেখায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রেনচালক জানান, অনেক ট্রেনচালক বাধ্য হয়েই চোরাকারবারিদের ইশারায় ট্রেন দাঁড় করান। প্রাণের ভয়েই চুরির সুযোগ করে দেন।
স্টেশনমাস্টার সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন রাতে ধলেশ্বরী ট্রেন থামিয়ে চুরির সময় চিহ্নিত তেলচোর নান্দিনা বাজার এলাকার আহম্মদ আলীর ছেলে আকরাম ও খোরশেদ মিয়ার ছেলে অলিকে গ্রেফতার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র, ৬ ড্রামভর্তি ট্রেনের ডিজেল এবং চুরি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এদিকে দু’অঞ্চলে থাকা ১১টি শেড থেকে অহরহ তেল চুরি হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, শেডগুলোতে যখন ট্রেন শানটিং করা হয় তখন ইঞ্জিন ও পাওয়ার কারে বিশেষ কায়দায় তেল রাখা হয়, যা পরে বিক্রি হয়ে যায়। আবার শেডে হিসাবের বাইরেও তেল জমা হয়, যা পরে মালবাহী কিংবা যাত্রীবাহী ইঞ্জিনে সরবরাহ করা হয়।
এ কাজে শেডের কর্মকর্তা এবং চালকরা উভয়ই আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে থাকেন। অবসরপ্রাপ্ত এক ট্রেনচালন বলেন, ইঞ্জিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল রাখতে হয়। চালকরা যখন ট্রেন থেকে বেশি তেল বিক্রি করে ফেলেন, তখন শেডে এসে তা পূরণ করে নেন। শেডে থাকা অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন ইঞ্জিন থেকে কম টাকায় তেল কিনেও রাখেন।
মাহমুদ





