রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসান উল্লাহ আনছারী ওরফে বিপ্লব নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির উত্তরাঞ্চলের অন্যতম মাস্টার মাইন্ড বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
রংপুরে জাপানি নাগরিক ওসি কুনিও হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি হিসেবে ইতোমধ্যে তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ ছাত্রদের তালিকায়ও তার নাম আছে। তবে তার ছাত্রত্ব এখনও অটুট রয়েছে।
ওসি কুনিও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ আদালতে যে চার্জশিট দাখিল করেছে, সেখানে বিপ্লবকে জাপানি নাগরিক হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫ সালে ৩ অক্টোবর ওসি কুনিওকে হত্যা করা হয়। এর ১২ দিন পর ১৬ অক্টোবর থেকে বিপ্লব আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি।
ওসি কুনিও হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, এর আগে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি মাসুদ রানা আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, বিদেশি নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য তাদের প্রতি হাই কমান্ডের নির্দেশ ছিল।দেশকে অস্থিতিশীল করতে পারলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, তখন ইসলামি অভ্যুত্থান করা সহজ হবে। এ জন্যই তারা জাপানি নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা করে।
জবানবন্দিতে মাসুদ রানা আরও জানায়, পলাতক জঙ্গি সাদ্দাম জাপানি নাগরিককে হত্যার টার্গেট করে। এরই ধারাবাহিকতায় জঙ্গি মাসুদ রনা, বিজয়, বাইক হাসান ও আহসান উল্লাহ ওরফে বিপ্লব ওসি কুনিওকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা হত্যাকাণ্ডের ৮/১০ দিন আগে থেকে কুনিও’র গতিবিধির ওপর নজর রাখতে শুরু করে। তারা জাপানি নাগরিকের ঘাসের খামার কাচু আলুটারী গ্রামে মোটরসাইকেলে করে গিয়ে তাকে অনুসরণ করে। হত্যাকাণ্ডের ৩ দিন আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ওসি কুনিও’র বাড়ির সামনে একটি চায়ের দোকানে জঙ্গি আহসান উল্লাহ বিপ্লব, সাদ্দাম ও হাসান চা পান করে তার গতিবিধি লক্ষ্য করে। পরে ৩ অক্টোবর কুনিওকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা।
চার্জশিটে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, জঙ্গি বিপ্লবসহ অন্যান্য জঙ্গিরা রংপুর নগরীর ছোট নূরপুর এলাকায় আব্দুল আজিজ নামে এক ব্যক্তির বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে অবস্থান করে। মাসুদ রানা , বিজয় ও বাইক হাসান সরাসরি হত্যার মিশনে অংশ নেয়। আর বিপ্লব মিশন সফল করার অংশ হিসেবে কাছেই সড়কে অবস্থান নিয়েছিল।
পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে দেখা যায়, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আহসান উল্লাহ বিপ্লব ওসি কুনিও হত্যাকাণ্ডের মাস্টার মাইন্ডদের অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর আরও ১৩ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে এবং ক্লাশ করেছে বিপ্লব। ১৬ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আহসান উল্লাহ বিপ্লব তিন বছর আগে থেকেই জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এরপর এক বছর সে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার পর আবার নতুন করে ভর্তি হয়ে ক্লাসে অংশ নিয়েছে ও পরীক্ষা দিয়েছে। জাপানি নাগরিককে হত্যার পর ১৬ অক্টোবর থেকে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি। আর ২৩ দিন পর ১০ নভেম্বর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধূপুরে মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যার কিলিং মিশনে সে অংশ নেয়। পুলিশ জাপানি নাগরিক ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলায় বিপ্লবের নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। তবে এখনও সে গ্রেফতার হয়নি।
এদিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দফতর সূত্রে জানা গেছে, আহসান উল্লাহ আনছারী ওরফে বিপ্লবের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ফোরকারহাট গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল হাসিব আনছারী। সে ২০০৯ সালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে রংপুর ক্যান্টনম্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়। সেখান থেকে ২০১১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর সে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কিছুদিন ক্লাস করার পর সে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল। দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়নি। এক বছর পর ২০১৩-১৪ শিক্ষা বর্ষে সে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হয় এবং প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নেয়। সর্বশেষ সে গত বছর ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর পরিসংখ্যান বিভাগের ভাইবা বোর্ডে উপস্থিত হয়েছিলো। এরপর থেকে তার আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি চলতি বছর ১৪ জানুয়ারি পরবর্তী সেমিস্টারে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও সে আর আসেনি।
এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘যেহেতু পরপর ২টি সেমিস্টার ড্রপ দিয়েছে, এ কারণে সে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তার ছাত্রত্ব চলে গেছে।’ কিন্তু কেন লিখিতভাবে তার ছাত্রত্ব বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি- জানতে চাইলে তিনি জানান, ওই ছাত্রের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি রেজিস্ট্রার দফতরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ইব্রাহিম কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আহসান উল্লাহ আনছারীর ছাত্রত্ব বাতিলের লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে সে যে নিখোঁজ রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে সে বিষয়ে যাবতীয় তথ্য রংপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’
/এফএস/ এপিএইচ/
আরও পড়ু





