কিছুদিন আগের ঘটনা। উত্তর বাড্ডার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন জামিল শেখ ও আরজিনা বেগম। তাদের নয় বছর বয়সী স্কুল পড়ুয়া নুসরাত নামের একটি মেয়েও ছিল।

গত ২রা নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে বাড্ডার ময়নানগরের তিন তলা বাসার ছাদ থেকে পুলিশ জামিল শেখ ও তার মেয়ে নুসরাতের লাশ উদ্ধার করে। পরে ওই দিন রাতেই জামিল শেখের ভাই শামিম শেখ বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ নিহত জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনা বেগমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বের হয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

নিজের পরকীয়া সম্পর্কের কথা তার স্বামী জেনে যাওয়ায় প্রেমিক শাহিনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেন। আর বাবা হত্যার ঘটনা মেয়ে দেখে ফেলার কারণে ঠিক একই সময় মেয়ে নুসরাতকেও হত্যা করা হয়। ঠিক এভাবেই পারিবারিক কলহের জের ধরে গত ছয় বছরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৮৪৮টি। অর্থ্যাৎ গড়ে প্রতি বছর পারিবারিক কলহের জের ধরে প্রাণ হারাচ্ছে প্রায় ৩ শতাধিক।

ঠিক তার কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কাকরাইলে মা ও ছেলে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয় পারিবারিক কলহের কারণে।

সমাজের পাশাপাশি এখন এটি রাষ্ট্রীয় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ একটি পরিবারকে নিয়ে গড়ে উঠে সমাজ। আর সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে রাষ্ট্র।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সামাজিকভাবে ন্যায়বিচার না থাকার জন্য এর প্রভাব ব্যক্তি জীবনে পড়ছে। আর ব্যক্তি থেকে সমাজ পরিবার পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

আবার অনেকের মতে, বর্তমান সময়ে মানুষ মানুষের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সম্পর্কগুলোকে মূল্যায়ন করছে না। এজন্য বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক খুব সহজে তৈরি হচ্ছে। যার কারণে সংসারে অশান্তি-হতাশা বাড়ছে। হতাশা চরমে পৌঁছালে তখনই অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) তথ্য অনুযায়ী গত ছয় বছরে পারিবারিক কলহে সারা দেশে নিহত হয়েছেন ১৮৪৮ নারী-পুরুষ। এরমধ্যে ২০১২ সালে পারিবারিক কলহে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ১৭৭ ও আহত হয়েছেন ৪৩ জন নারী, ২০১৩ সালে নিহত হয়েছেন ১২৬ ও আহত হয়েছেন ৩৩ জন নারী, ২০১৪ সালে নিহত হয়েছেন ৩৮৯ ও আহত হয়েছেন ১৮২ জন নারী, ২০১৫ সালে নিহত হয়েছেন ৩৭৯ ও আহত হয়েছেন ৩২৭ জন নারী-পুরুষ, ২০১৬ সালে নিহত হয়েছেন ৩৮৪ ও আহত হয়েছেন ৩১৩ জন নারী-পুরুষ এবং ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৩৯৩ ও আহত হয়েছেন ১০৫ জন নারী-পুরুষ।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা সোহেল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক কলহে হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। কারণ এখনকার পরিবারগুলোর মধ্য সম্প্রীতির অভাব রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক বন্ধন থেকে দূরে চলে যাওয়া, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সুষ্ঠু বিনোদনের অভাব, ভারতীয় সিরিয়াল থেকে অপসংস্কৃতির বীজ চলে আসার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটছে।

এছাড়া বেকারত্ব, হতাশা ও পরকীয়ার কারণে স্বামী হত্যা করছে স্ত্রীকে। স্ত্রী হত্যা করছে স্বামীকে। এমনকি বাবা মা হত্যা করছে সন্তানকে আবার সন্তান বাবা মাকে। তিনি বলেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে কিছু মামলার আসামিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত আসামির শাস্তি নিশ্চিত করতে দেশের গণমাধ্যমকে আরো বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে আসামির শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত গণমাধ্যমে ফলোআপ করতে হবে।
ডেজ