মাদক ব্যবসা কিংবা পাচারের সঙ্গে জড়িত তালিকাভুক্ত প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্যের ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশের প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অফিসের তালিকাভূক্ত দেশের বিভিন্ন জেলার এই একশো পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা কিংবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের।
এদিকে, অন্যান্য আরো কিছু জেলার যে ২০০ পুলিশ সদস্যের নাম প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তালিকায় রয়েছে, মাদকের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে তা এখনো সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত তালিকাভূক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে, কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের আলোকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ৩০০ পুলিশ সদস্যের একটি তালিকা করে।
অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রস্তুতকৃত এই গোপন তালিকায় থাকা ৩০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়াসহ সরাসরি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
পরবর্তীতে এই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয় সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে।
ইংরেজি দৈনিক দ্যা ডেইলি স্টার তালিকাভূক্ত এমন ১০৭ পুলিশ সদস্যের নাম হস্তগত করতে সক্ষম হয়।
এরমধ্যে রয়েছেন খুলনা বিভাগের ৩৪ জন, রংপুরের ২৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৬ জন, গাইবান্ধার ১৩ জন, কুড়িগ্রামের ১০ জন এবং কক্সবাজার ও লালমনিরহাটের যথাক্রমে ৫ জন করে পুলিশ সদস্যের নাম।
এর মধ্যে খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুড়িগ্রামের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দাবি করেন যে এই অভিযোগ তদন্ত করে তারা কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেই কিছু পাননি।
অবশ্য, খুলনার এস পি (Superintendent of Police) এস এম শফিউল্লাহ বলেন, যেহেতু কিছু পুলিশের নাম তালিকায় রয়েছে তাই আমরা তাদের কয়েকজনকে বিভিন্ন স্টেশনে বদলি করেছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত এস পি ইকবাল হোসাইন বলেন, তারা কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেই কিছু পাননি।
এদিকে, রংপুরের এস পি মিজানুর রহমান বলেন, তাদের তদন্ত এখনো চলছে এবং এ পর্যন্ত তারা কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাননি।
অন্যান্য জেলাগুলোতেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের অবস্থানও প্রায় একই ধরনের।
তবে, ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তালিকায় থাকা পুলিশ সদস্যদের মাদকচক্রের সঙ্গে গোপন আঁতাত রয়েছে।
উদাহরণস্বরুপ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানার অফিসার-ইন-চার্জ (OC) মোশাররফ হোসাইন তরফদারের বিরুদ্ধে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হান্নান মিয়া ওরফে হান্নান মেম্বারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতারাসহ এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেরই অভিযোগ ওসি মোশাররফ কখনোই মাদকের হোতা হান্নানের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাননি। উপরন্তু তাদের দু‘জনকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে একসাথে দেখা গেছে।
এছাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার ওসি আলি আরশাদের নামও রয়েছে মাদকের তালিকায়।
বিজয়নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হোসাইন মোহাম্মাদ দুলাল বছরের পর বছর ধরে ওসি আলি আরশাদের যোগসাজশে এলাকায় ফেনসিডিলের ব্যবসা করছে। স্থানীয় উপজেলা ছাত্র লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আল আমিন এমন অভিযোগ করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ শাখা ও গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (additional deputy inspector general -special affairs and intelligence) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান দাবি করেন, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তবে, কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তালিকাভুক্ত মোট পুলিশ সদস্য কতজন রয়েছেন জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তিনি এখনি বিষয়টি মনে করতে পারছেন না। তবে, আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ হতে পারে।
উল্লেখ্য, ভয়ানক নেশার দ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেটসহ পুলিশ সদস্য গ্রেফতার এমন খবর প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনামে আসছে।
এর মধ্যে সবশেষ শনিবার (১১ আগস্ট) খুলনার খালিশপুরে ১০৫০টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই পুলিশ সদস্যকে আটক করা হয়।
এদের মধ্যে রয়েছেন সহকারি আর্মড পুলিম ব্যাটালিয়নের (APBn) সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (DB) পুলিশের কনস্টেবল সোহানুর রহমান।
গত ৯ই জুন ময়মনসিংহের আদালত চত্তরে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রির সময় ডিবি পুলিশের কনস্টেবল আল আমিনকে গ্রেফতার করা হয়।
এর আগে গত ২৩শে এপ্রিল ডিবির সহকারি সাব-ইন্সপেক্টর নাসির উদ্দিনকে ৪০০০ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করা হয় রাঙ্গামাটি থেকে।
এছাড়া গত ৮ই মার্চ নারায়নগঞ্জ ডিবির হাতে ৫০,০০০ ইয়াবাসহ ধরা পড়েন এ এস আই সোহরাওয়ার্দী রুবেল।
পুলিশ বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায়ই এ ধরনের অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যরা ধরা পড়ছেন কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
উদাহরণস্বরুপ, সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের শৃঙ্খলা ও পেশাদারি দক্ষতা (discipline and professional standard) বিষয়ক শাখা কক্সবাজারের এস পি ইকবাল হোসাইন ও অপরাপর ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দেখতে পান যে তারা প্রায় দশ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করেছেন। এই ট্যাবলেটগুলো গত বছরের (২০১৭) ২৭শে অক্টোবর ডিবি জব্দ করেছিল।
এস পি ইকবালসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা যাদের মধ্যে রয়েছেন দুজন অতিরিক্ত এস পি, চারজন সাব-ইন্সপেক্টর ও সহকারী ইন্সপেক্টর এবং তিনজন কনস্টেবল, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করা হয়েছে।
কিন্তু অদ্যবদী এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো কর্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। গত বুধবার (৮ আগস্ট) নামকাওয়াস্তে দুজন অতিরিক্ত এস পিকে বদলি করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডেপুটি মহা-পরিচালক হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি, খুব শিগগিরই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অবশ্য বলেন, কাউকেই কোনোরুপ ছাড় দেয়া হবে না। (সূত্র: ডেইলি স্টার)





