কল্যাণপুরে ‘জঙ্গি আস্তানা’য় পুলিশের গুলিতে আহত রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান ও তাঁর দুই বন্ধু একই দিনে তাঁদের বগুড়ার বাড়ি ছাড়েন। তাঁদের একজন পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক ইব্রাহীম মোল্লা হত্যা মামলায় এবং অপরজন সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। দুজনই নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির সদস্য।
রাকিবুল হাসানের দুই বন্ধুর নাম মাসুদ রানা ও মোহাইমিনুল ইসলাম শিহাব। পুলিশের সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্দেশীয় অপরাধ দমন টিমের (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গতকাল বুধবার বলেন, রাকিবুল জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, গত বছরের ২৬ জুলাই তিনি তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে বগুড়া ছাড়েন। বাসে করে তাঁরা ঢাকায় আসেন।
মিরপুরের একটি বাড়িতে তাঁরা অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন। রাকিবুলকে তাঁরা অনেক দিন ধরার চেষ্টা কররছিলেন বলেও জানান।
কল্যাণপুরে অপারেশন স্টর্ম ২৬-এ পুলিশের গুলিতে রাকিবুলের পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। মাথাতেও সামান্য আঘাত আছে। পুলিশ বলছে, তাজ মঞ্জিল থেকে রাকিবুল ও ইকবাল পালানোর চেষ্টা করেন। ইকবাল পালিয়ে যেতে পারলেও পুলিশ রাকিবুলকে ধরে ফেলে। এই অভিযানে নয় জঙ্গি নিহত হন।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীর পর্বত সিনেমা হলের সামনে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক ইব্রাহীম মোল্লাকে ছুরি মেরে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। সে সময় ঘটনাস্থল থেকে মাসুদ রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলে হামলার ঘটনায়ও এই মাসুদ রানা অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। ওই ঘটনায় ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে মাসুদ রানা বলেন, তাজিয়া মিছিলে হামলায় তাঁরও হাজির থাকার কথা ছিল। এর আগেই গ্রেপ্তার হওয়ায় তিনি সেখানে হাজির হতে পারেননি।
তবে হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানতেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। পুলিশ বলছে, মাসুদ রানার তথ্যের ভিত্তিতে তারা রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে।
মোহাইমিনুল ইসলাম শিহাব গ্রেপ্তার হন ২ জুন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় বোনের বাড়ি থেকে। এ বছরের ৩ এপ্রিল রাতে বগুড়ার শেরপুরের জোয়ানপুর কুটিরভিটা গ্রামের বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মোহাইমিনুল গ্রেপ্তার হন।
পুলিশ বলছে, ওই বাড়িটি ছিল জেএমবির বোমা তৈরির কারখানা। বিস্ফোরণে ওই রাতে ঘটনাস্থলে নিহত হন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরিকুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের ছাত্র রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিন।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের কথার সূত্র ধরে মোহাইমিনুলকে ধরা হয়।
গতকাল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বগুড়া থেকে রাকিবুলের মা রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘বছর দু-এক আগে শিহাবরা (মোহাইমিনুল ইসলাম) জামিলনগরে আমার বাসা ভাড়া নেয়। ছেলেটা পুলিশ লাইনস স্কুলে পড়ত। সেখান থেকে শাহ সুলতান কলেজে আমার ছেলের সঙ্গে ভর্তি হয়। ওই কলেজের বাণিজ্য শাখার ছাত্র ছিল মাসুদ রানা। কী দিয়ে কী দিয়ে (কীভাবে যেন) বন্ধু হয়ে গেল। ওরাই আমার ছেলের সর্বনাশ করিছে।’ রাকিবুল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন। কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে তিনি নিখোঁজ হন।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে মোহাইমিনুলের মা জাহানারা বেগম বগুড়ার শেরপুর থেকে বলেন, রাকিবুল তাঁর ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন। মোহাইমিনুলের বাবা সৌদিপ্রবাসী। বগুড়ার মেসে থেকে লেখাপড়া করতে অসুবিধা হচ্ছিল বলে জামিলনগরে বাসা ভাড়া নেন। সেখানেই রাকিবুল তাঁর ছেলেকে মাসুদ রানার সঙ্গে পরিচয় করান।
আদমদীঘির কেশরতা গ্রামে মাসুদ রানার স্বজনেরা বলেছেন, মাসুদ রানা শান্ত ধরনের ছিলেন। বগুড়ায় মেসে থাকতেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে কিছুদিন বাড়ির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না।
রাকিবুল হাসান এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগে চিকিৎসাধীন। এই বিভাগের চেয়ারম্যান মো. শামসুজ্জামান বলেন, রাকিবুলের পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। মাথায়ও সামান্য আঘাত আছে। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।
কল্যাণপুরের ঘটনায় মিরপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহজালাল আলম সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। এ মামলার এক নম্বর আসামি রাকিবুল।
পুলিশ বলছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাকিবুল ওই ফ্ল্যাটে কারা কারা থাকত, সে সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কল্যাণপুরে তাজ মঞ্জিলে জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতারা আসতেন। তাঁরা জিহাদি কথাবার্তা বলে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতেন।
পুলিশ বলছে, গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার পর আরও নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে জেএমবি সদস্যরা কল্যাণপুরে ঘাঁটি গেড়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, এর আগে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি ও হোসেনি দালানের তাজিয়া মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটিয়ে জেএমবি তাদের ‘শক্তিশালী’ উপস্থিতির জানান দিতে চেয়েছিল। ওই দুটি ঘটনার দুই মাসের মাথায় জেএমবির ঢাকা উত্তরের সামরিক শাখার প্রধান আবদুল্লাহ আল নোমান, দক্ষিণের প্রধান আলবানি ওরফে হোজ্জা ওরফে মাহফুজ এবং সামরিক শাখার সেকেন্ড-ইন কমান্ড সাঈদ ওরফে হিরন ওরফে কামাল নিহত হন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। পুলিশ জানায়, এরা শাহআলী থানার ব্লক এ-র ৩নং বাসায় নিয়মিত যেত এবং গ্রেনেড তৈরি ও জঙ্গি প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করত।
মূল নেতারা ক্রসফায়ায়ে নিহত হওয়ার পর ঢাকা অঞ্চলে সমন্বয়কের দায়িত্ব নেন রায়হান কবির ওরফে তারেক। আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে পুলিশ রায়হানকে খুঁজছিল।
সূত্রগুলো বলছে, শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পরও জেএমবির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছিল। কল্যাণপুরে নিহত নয় জঙ্গির একজন রায়হান কবির ওরফে তারেক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ জেএমবিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই নিয়ে এসেছিল। গুলশান হামলার দিন দশেক আগে তারা আঁচ করেন জঙ্গিরা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে। এরপরই হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনা ঘটে।
কল্যাণপুরে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার রাকিবুল হাসান জেএমবি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। কল্যাণপুরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও অজ্ঞাতনামা অনেককে আসামি করে মামলা করে পুলিশ।
এমবিএইচ





