একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবাতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা একেএম ইউসুফের পোস্টমর্টেম করার (ময়না তদন্ত) ব্যাপারে কারা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
একই সঙ্গে কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা জানাতে কারা মহা পরিদর্শককে (আইজি প্রিজন) নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
রোববার চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
মাওলানা ইউসুফের মৃত্যুর পর পোস্টমর্টেম ছাড়াই তার মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে নির্দেশনা চেয়ে  ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন আসামিপক্ষ।
আদেশে ট্রাইব্যুনাল ইউসুফের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তার সঠিক কারণ জানতে চায়। এজন্য  মৃত্যুর যথাযথ কারণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্ত করা ছাড়া তার লাশ স্বজনদের নিকট হস্তান্তরে আসামিপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দেন।
মাওলানা ইউসুফের পক্ষে করা আবেদনে বলা হয় যে, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তাই তার ময়নাতদন্ত না করা হোক। ট্রাইব্যুনালের এ আদেশের ফলে ইউসুফের ময়নাতদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী।
আবেদনের পক্ষে ছিলেন মরহুম ইউসুফের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গাজী তমীম শুনানি করেন। অপরদিকে সৈয়দ হায়দার আলী বিরোধীতা করেন।
শুনানিতে গাজী তমীম বলেন, ইউসুফের পরিববার তার লাশ পোস্টমর্টেম ছাড়াই দাফন করতে চা্য়। এ সংক্রান্ত আদেশ দেয়ার জন্য কারা কতৃপক্ষকে আপনারা নির্দেশনা দিন। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনারা কিভাবে বুঝলেন যে তার মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে। জবাবে তামীম বলেন, আইনজীবীদের পক্ষ থেকে নয়, পরিবার ও আত্নীয়-স্বজনের দাবি যেহেতু তার বয়স ৮৯ বছর, স্বাভাবিক মৃত্যুটাই কাম্য। ট্রাইব্যুনাল জানতে চান তিনি কার অধীনে ছিলেন, আইনজীবী বলেন, জেল কতৃপক্ষের অধীনে।
ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, যেহেতু তিনি কারাগার থেকে চিকিৎসারর জন্য হাসপাতালে আশার পখে মারা গেছেন সেহেতু তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে কিনা আমরা তা বলতে পারি না। মরহুম ইউসুফ সাহেব ট্রাইব্যুনালের নির্দেশেই তিনি কারাগারে আটক ছিলেন। তাই তিনি মারা যওয়ার সঠিক কারণ আমাদেরও জানা দরকার। আমরা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে পাঁচ মিনিট পরে আর্ডার দিব বলে ট্রাইব্যুনাল উঠে যান। পাঁচ মিনিট পরে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেন।  
রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে একেএম ইউসুফ (৮৯) মারা যান। রোববার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক আবদুল মজিদ ভুঁইয়া তার মারা যাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একেএম ইউসুফকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর ‘ব্লাড প্রেসার ও পালস’ (রক্তচাপ ও স্পন্দন) পাওয়া যাচ্ছিল না। হাসপাতালের হূদরোগ বিভাগের সিসিইউতে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইউসুফের আইনজীবী তাজুল ইসলাম ও মিজানুল ইসলাম বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একেএম ইউসুফ মারা গেছেন।
একাত্তরে রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত জামায়াত নেতা ইউসুফের বিরুদ্ধে গত বছরের ১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৩টি অভিযোগ গঠন করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটির কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল।
এরআগে রোববার সকাল সাড়ে ১১ টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউসুফের মৃত্যু দয়।
গত ১ আগস্ট মাওলানা ইফসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। গত ৬ মে তার পক্ষে করা জামিন আবেদন খারিজ করেছেন।
গত ১২ মে ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ধানমন্ডির বাসা থেকে জামায়াতের এই নেতাকে গ্রেফতার করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ৮ মে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর রাষ্ট্রপক্ষে কৌসুলি অ্যাডভোকেট হৃষিকেষ সাহা ১৫ টি অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে।
গত ২২ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে তদন্তের চুড়ান্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপক্ষ বরবার জমা দেন তদন্ত সংস্থা।
একাত্তরে ৭শ জনকে গণহত্যা, ৮ জনকে হত্যা, ২শ হিন্দু লোককে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাসহ ৩শ বাড়ী লুন্ঠন এবং ৪শ দোকান লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করার অপরাধ আনা হয়েছে।
একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে (ফরমাল চার্জে) মূল ৮৫পৃষ্ঠার ১৫ টি অভিযোগের ভিত্তিতে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয় ।
তদন্ত সুত্রে জানা যায় একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তদন্ত শুরু করে গত ২১ এপ্রিল শেষ করে।
গত ২৩ জুন একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করার আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশে পাকিস্তানিদের গঠন করা কথিত মালেক সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ইউসুফ এক সময় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বও পালন করেছেন।
[b]ঢাকা, জিই ফেব্রুয়ারি ৯ (টাইমনিউজবিডি.কম)
[/b]