ট্রাক হেলপারের কাজ নিয়ে ২০০৩ সালে ঢাকায় এলেও পরে জাল টাকা তৈরির দক্ষ কারিগর বনে যান রহিম শেখ। জাল টাকা বানাতে একাধিক বিয়েও করেন তিনি। দুই স্ত্রী ছাড়াও জাল টাকা তৈরির কাজে গ্রামের নিকটাত্মীয় মহিলাদেরও ব্যবহার করতেন তিনি।
শনিবার রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর র্যাব কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানান রহিম শেখ।
র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুর রহিম শেখ জানান, ২০০৩ সালে পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে হেলপার হিসেবে কাজ নেন। সেখানে কর্মরত অবস্থায় ২০০৮ সালে মোহাম্মদপুরের জালটাকা তৈরির একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত হন। ওই চক্রের প্রধান ছিলেন হুমায়ুন। সেখানে আবদুর রহিমের কাজ ছিল রাজধানীর বিভিন্নস্থানে এজেন্টদের কাছে জাল টাকা পৌঁছে দেওয়া।
বেশ ক'বছর ওই চক্রের সঙ্গে কাজ করেন রহিম শেখ। চক্রের মূল হোতা হুমায়ুনের আস্থা অর্জন করে জালটাকা তৈরির সকল কারিগরি বিদ্যা হাতে-কলমে শিখে নেন রহিম শেখ। গত কয়েক বছর রহিম শেখ নিজেই ল্যাপটপ ও প্রিন্ট্রার কিনে ঢাকার বনশ্রী আবাসিক এলাকায় নিরিবিলি স্থানে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জাল টাকা তৈরির রমরমা ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে রহিম শেখ তার দুই স্ত্রী ছাড়াও প্রায়ই গ্রামের বাড়ি থেকে নিকটাত্মীয়দের ঢাকায় এনে জাল টাকা তৈরির কাজ করাতেন।
গ্রেফতারের সময় রহিমের কাছ থেকে যে পরিমাণ খালি টিস্যু পেপার ও সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা দিয়ে আরও ১০ কোটি টাকা মূল্যের অধিক জালটাকা তৈরি করা যেতে বলে জানান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ। তিনি বলেন, এসব টাকা ছাপানোর পাশাপাশি ঈদের পর থেকে ইন্ডিয়ান জাল রুপি ছাপানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছিল তারা। এজন্য তারা ইন্ডিয়ান রুপিতে নিরাপত্তা সূতা হিসেবে ব্যবহৃত ফয়েল বিপুল পরিমাণে মজুদও করেছিল।
শনিবার রাতে রাজধানীর বনশ্রী আবাসিক এলাকার কে ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে রহিম শেখ, তার প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মোসাম্মৎ রুবিনা খাতুন, সহযোগী মোহাম্মদ আসাদ ও মোহাম্মদ তাজিম হোসেনকে গ্রেফতার করে র্যাব-৩ এর একটি দল। একই সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এক কোটি চার লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যমানের জাল টাকা, ১১টি জাল টাকা তৈরির স্ক্রিন, তিনটি বোর্ড, দুটি বিশেষ ডট কালার প্রিন্টার, দু'টি ল্যাপটপ, চার রোল টাকার ভেতরের নিরাপত্তা সুতার ফয়েল, দুই কৌটা টাকার জলছাপে ব্যবহৃত আইপিআই প্রিন্ট্রিং কালি, ২০০টি প্রিন্টারের কার্টিজ, এক বোতল রেডোসার ক্যামিক্যাল, আট রিম টাকা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, একটি টাকা স্ক্যানার, একটি লেমিনেটিং মেশিন এবং দু'টি টাকা কাটিং গ্লাস। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে ভারতীয় রুপি তৈরির জন্য ভারতীয় রুপির নিরাপত্তা সূতা সংবলিত ফয়েল উদ্ধার করা হয়।
র্যাব কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আবদুর রহিম শেখ জানান, জালটাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত টিস্যু কাগজ ঢাকার বাবু বাজার থেকে কিনতেন। টাকার ভেতরের নিরাপত্তা সূতার ফয়েল চকবাজার থেকে, স্ক্রিন, বোর্ড ও রেডোসার কেমিক্যাল মালিটোলা থেকে এবং আইপিআই প্রিন্টারের কালি পল্টন থেকে সংগ্রহ করতেন।
রহিম শেখ র্যাব কর্মকর্তাদের জানান, টাকা তৈরির জন্য প্রথমে টিস্যু কাগজের এক পার্শ্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি স্ক্রিনের নিচে রেখে গাম দিয়ে ছাপ দেওয়া হতো। এরপর ৫০০ ও ১০০০ লেখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের ছাপ দেওয়া হয়। অন্যে একটি টিস্যু পেপার নিয়ে তার সঙ্গে ফয়েল পেপার থেকে টাকার পরিমাপ অনুযায়ী নিরাপত্তা সূতা কেটে তাতে লাগিয়ে সেই টিস্যুটি এর আগে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবির জলছাপ দেওয়া টিস্যু পেপারের সঙ্গে গাম দিয়ে সংযুক্ত করে দিতেন তারা।
এভাবে টিস্যু পেপার প্রস্তুত করে বিশেষ ডট কালার প্রিন্টারের মাধ্যমে ল্যাপটপে সেইভ করা টাকার ছাপ অনুযায়ী প্রিন্ট করা হতো। পরে কাটিং গ্লাসের ওপরে রেখে নিখুঁতভাবে কাটিং করা হতো জাল টাকা। এরপর বিশেষভাবে বান্ডিল করে মোহাম্মদ আসাদ ও মোহাম্মদ তাজিম হোসেনসহ আরও পাঁচ-ছয়জন প্রতারকের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো বলে জানান রহিম শেখ।
জেআই





