ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নীলক্ষেতে ফাঁকা জায়গায় অবৈধভাবে ছাদের উপর ছাদ দেখিয়ে অস্থায়ী ৪তলা পাকা মার্কেটে ১১২টি দোকান বরাদ্দ এবং অর্থ আত্মসাতের মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে।

সূত্র মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ পরিচালক আব্দুস সোবহান চলতি মার্চ মাসেই সংশ্লিষ্ট শাখায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মামলার ৯ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন।
আগামী সপ্তাহে অবৈধ দোকান বরাদ্দ প্রাপ্ত কথিত ব্যবসায়ি ও জালিয়াত চক্রের নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে বলে জানা যায়।

ইতোমধ্যে মামলার তদন্তকালে দুদকের উপ পরিচালক আব্দুস সোবহান নীলক্ষেতে ফাঁকা জায়গায় জালিয়াতির মাধ্যমে ছাদের উপর ছাদে উল্লেখ করে ৪তলা মার্কেটের নামে ১১২টি দোকান সংক্রান্ত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছেন।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপ পরিচালক মাহবুব আলম বাদী হয়ে নীলক্ষেতে ফাঁকা জায়গায় অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ডিএসসিসির সাবেক প্রশাসক খলিলুর রহমানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেন। মামলা নম্বর ৩৭। থানায় দন্ডবিধি ৪২০/ ৪৬৬/ ৪৬৮/৪০৯/১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়।

মামলায় অভিযুক্ত ৯ আসামিরা হলো- ডিএসসিসির সাবেক প্রথম প্রশাসক খলিলুর রহমান, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুলতান উল ইসলাম চৌধুরী, দুর্নীতির বরপুত্র বলে খ্যাত কানুনগো মো. আলী, সাবেক প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন, সাবেক সম্পত্তি কর্মকর্তা বর্তমানে বাগেটহাট জেলার কলরোয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিদারুলল আলম, সার্ভেয়ার মুরাদ হোসেন, সার্ভেয়ার সৈয়দ রুমান এবং নীলক্ষেতের অবৈধ মার্কেটের দোকান-মালিক সমিতির সভাপতি একেএম শামসুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন।

জানা যায়, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা উপ পরিচালক আব্দুস সোবহান নোটিশ পাঠিয়ে পৃথক ভাবে ওই ৯ আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু দুদকের জিজ্ঞাসাবাদকালে আসামিরা সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি বলে জানা যায়। একই সঙ্গে আসামিরা দায় এরাতে গিয়ে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর ও নতুন তথ্য প্রকাশ করেছেন।

১১২ টি দোকান বরাদ্দের আবেদনকারীর পক্ষে মাত্র ৫/৬ জন ব্যক্তি সই করেন। বরাদ্দের চিঠি ইস্যুর পরই মোটা অংকের টাকায় ইচ্ছামতো বিক্রি করেন।

জানা যায়, ২০১২ সালের ১ এপ্রিল সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সুপারিশের একটি আবেদন পত্রের উপর ভিত্তি করে ওই বছর ১৪ এপ্রিল কানুনগো মো.আলী ১১২টি দোকান বরাদ্দের পক্ষে প্রশাসকের নির্দেশের নথি উপস্থাপন করেন। ১৯ এপ্রিল ওই নথিতে সার্ভেয়ার সৈয়দ রুমান, সার্ভেয়ার মো. মুরদ হোসেন দোকান বরাদ্দের প্রস্তাবের পক্ষে মতামত দেন।

২৩ এপ্রিল তৎকালীন সম্পত্তি কর্মকর্তা দিদারুল আলম এবং ৩০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন বরাদ্দের পক্ষে সিদ্ধান্তের জন্য পাঠান। ২০১২ সালে ১০ মে তৎকালীন প্রশাসক মা. খলিলুর রহমান অস্থায়ী ভাবে ১৫ টাকা বর্গফুট ভাড়া নির্ধারণ করে ১১২টি দোকান বরাদ্দের নির্দেশ দেন।

ফাঁকা জায়গায় নিচ তলায় দোকান ৩৮টি, প্রথম তলার ছাদে দোকান ৩৭টি, দ্বিতীয় তলার ছাদে দোকান ৩৭টি রয়েছে। আর দোকান বরাদ্দের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ১৬ কর্মকর্তাকে প্রদানের কথা থাকলেও কাউকে অনুলিপি দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে বরাদ্দের শর্তে বলা ছিল ব্যবসায়িরা নিজ খরচে ছাদের উপর ছাদ অর্থাৎ পাকা মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু অস্থায়ী বরাদ্দে কখনো স্থায়ী পাকা দোকান বানানোর বিধান নেই। এরপরও তারা অস্থায়ী বরাদ্দ উল্লেখ করে পাকা মার্কেট নির্মাণের নেয়ার শর্তারোপ করে ১১২টি দোকান বরাদ্দ দেন।

জানা যায়, ওই ঘটনায় ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসির পরবর্তী প্রশাসক তৎকালীন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুল্লাহ আল হারুনের নেতৃত্বে প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম, বাজার সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী সরদার ও সহকারি আইন কর্মকর্তা এসএম করীম খানের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এ তদন্ত কমিটি ২০১৩ সালে ৩ এপ্রিল প্রশাসকের দফতরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি দদেক চেয়ারম্যানের দফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দেন। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুলতান উল ইসলাম চৌধুরীকে বাদ দিয়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ফৌজদারি এবং বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু ডিএসসিসি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি এবং বিভাগীয় মামলা দায়ের করেনি। তবে দুদক অভিযুক্ত ওই ৯ জনের বিরুদ্ধেই থানায় মামলা দায়ের করেছে।

একে, জেএ