রাজধানীর কলাবাগান সার্কুলার রোড এলাকায় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বিএসসির ভাগ্নে ওবায়দুল হক হত্যাকান্ডের তদন্ত কাজে কোন ক্লু বা পথ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।প্রাথমিকভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ভাবা হলেও পুলিশের প্রশ্ন হচ্ছে ছিনতাই করলে ব্যাগ, টাকা পয়সা নিয়ে চলে যাবে কিন্তু গুলি করবে কেন? তাই এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে পুলিশ।

রোববার সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায় তার শনিবার দুপুরেই ওবায়দুলের দাফন সম্পন্ন করে পরিবারের সদস্যরা তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বাকুলিয়ার চাঁদগাঁওয়ে চলে যায়।

এদিকে, মামলা দ্বায়েরকারী তার খালাতো ভাই ইয়াসির মো. আদনানের সাথে বার বার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি।পরবর্তীতে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মামলার এজহারে উল্লেখিত আদনানের ল্যান্ড ফোনে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে বলা হয়, এটা তো অফিস।আপনি একটু পরে যোগাযোগ করেন আছে কিনা দেখি।কিছুক্ষন পরে যোগাযোগ করলে অপর প্রান্ত থেকে জানায় তিনি এখানে আসেন না।তার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা যায় জানতে চাইলে বলা হয়, ভাই আমাদের কারো কাছে তার নাম্বার নেই।কিভাবে যোগাযোগ করবেন তা বলতে পারবো না।

মামলার এজহারে উল্লেখিত তথ্যানুযায়ী ওবায়দুলের এ/পি ৫৭ নং সার্কুলার রোডের বাসায় গিয়ে দেখা যায় পাচিলে ঘেরা লাল রঙয়ের চার তলার একটি বাসা।মেইন গেট পার হলেই দেখা যায় বাসার সামনে সানোয়ার গ্রুপ কোয়ালিটি আইসক্রিমের অনেকগুলো তিন চাকার গাড়ি পড়ে আছে।একজন আইসক্রিম বিক্রেতা তার গাড়ি পরিস্কার করতে করতে বলেন তার (ওবায়দুলের) ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না।ভিতরে যান বসের সাথে কথা বলেন।

বাসার নিচ তলায় কোয়ালিটি আইসক্রিমের একটি অফিস।দ্বিতীয় তলায় ওবায়দুল হক তার স্ত্রী ও মাকে সাথে নিয়ে পাঁচ মাস ধরে থাকেন।তৃতীয় ও চতুর্থ  তলায় অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা থাকেন।পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার ছোট।বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছে।অন্য ভাই-বোনেরা বিভিন্ন জায়গায় থাকেন।

দুপুর পৌনে ১টার দিকে বাসার নিচ তলার ওই অফিসের দরজায় নক করলে কিছুক্ষন পর একজন চোখ মুছতে মুছতে দরজা খুলেন।দেখা যায় একটা রুমের মধ্যে দুইটা টেবিল ফাঁকা পড়ে আছে।কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর ট্রলি ইনচার্জ মো. নাসির উদ্দিন আসেন।

ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওবায়দুল ভাইয়া খুবই ভালো একজন লোক ছিলেন।আমি তো এখানে অনেক দিন আছি, উনিও এ বাসায় এসেছেন ৪/৫ মাস হলো।সব সময় দেখতাম মাথা নিচু করেই বাসা থেকে আসা-যাওয়া ও রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতেন।

আমার জানামতে তার মামা আওয়ামী লীগ নেতা হলেও তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না।এমনকি তার সাথে কারো কোন বিবাদও ছিলো না।আমাদের কোম্পানিতে সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো।এমনকি তার পরিবার বা স্ত্রীর সাথেও কোন রকম দ্বন্দ্ব হতে দেখিনি।তবে ইন্টারনাল কোন সমস্যা ছিলো কিনা সেটা আমি বলতে পারবো না।

ওই দিনের ঘটনার বিবৃতি দিতে গিয়ে ট্রলি ইনচার্জ আরও বলেন, ওই দিন রাতে ওবায়দুল ভাইয়া আসতে দেরি করছিলেন এবং কোন খোঁজ খবর না পেয়ে ভাবি আমার কাছ থেকে একজনের নাম্বার নেন যিনি এই কম্পানিতে আগে চাকরি করতেন।পরে চাকরি ছেঁড়ে দিয়ে অন্যত্র চাকরি নেন।

ওবাইদুলের স্ত্রীর কাছে অন্য কলিগদের নাম্বার না থাকায় তিনি উনার নাম্বারটা নেন।পরে উনার কাছ থেকে মাসুদের নম্বর নেন।মাসুদ যমুনা ফিউচার পার্কে একটি কোম্পানীর সেলস ম্যান  হিসেবে কর্মরত।তিনি ওবায়দুলের সাথেই ছিলেন।

মাসুদের সাথে ওবায়দুলের স্ত্রী ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি তো বাংলামোটরে নেমে গিয়েছি, ওবায়দুল ভাই বাড়ি চলে গেছেন।

ট্রলি ইনচার্জ নাসির আরও জানান, এর আগে ভাবির সাথে যখন ভাইয়ার সর্বশেষ কথা হয় তখন রাত ১২টা।ভাইয়া জানিয়েছিলেন এইতো প্রায় চলে আসছি।ওষুধ কিনতেছি, কিনেই চলে আসছি।

পরে রিক্সা ওয়ালার কাছ থেকে যা শুনেছি তা হলো ওষুধ ‍নিয়ে আসার সময় ১০৩ সার্কুলার রোডে আসলে, একটি মটর সাইকেলে তিন জন লোক রিক্সার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং সব কিছু দিয়ে দিতে বলে।কাছে থাকা ল্যাপটপ, মোবাইল, মানি ব্যাগ দিয়ে দেওয়ার পর তারা চলে যায়।পরে আবার ফিরে এসে তার মাথায় গুলি করে।

ফিরে এসে কেন গুলি করলো এটা বুঝলাম না।ওবায়দুল ভাইয়া তাদের উদ্দেশ্য করে কোন রকম খারাপ কথাও বলেননি।কারো সাথে ঝগড়া বা খারাপ কথা বলা ছেলে সে না।কিন্তু গুলি করলো কেন?

পরে ওই রিক্সা ওয়ালা তাকে থানায় নিয়ে যায় এবং ওসি তার গাড়িতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নিয়ে যায়।

মুদি দোকানদার মো. আলাউদ্দিনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি শোক প্রকাশ করে বলেন, ওবাইদুল ভাইয়ের মতো একজন লোক হয় না।খুবই ভালো মানুষ ছিলেন।তিনি আমার  একজন নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন।কোন দিন কারো সাথে গন্ডগোল করতে দেখিনি।অফিসে যাওয়া-আসা সকল সময় আমার সাথে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করতেন।

লন্ড্রি দোকানের এক মালিক বলেন, এই এলাকায় সে (ওবায়দুল) অল্প ক’দিন হয় এসেছে।তবে কারো সাথে কোন দিন কোন রকম ঝগড়া করতে দেখিনি।

স্থানীয়দের সাথে সুর মিলিয়ে পুলিশেরও ঠিক তেমনই বক্তব্য।এতে করে মামলার তদন্ত কাজে পুলিশ একটু হিমশিমই খাচ্ছে বটে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাকবাগান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনসার আলী টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দেখুন আমরা উভয় দিকটাই দেখছি।রাজনৈতিক, পারিবারিক বা কোম্পানীগত কোন সমস্যা আছে কিনা সকল দিকই দেখছি।মামলার তদন্ত কাজ শুরু করেছি মাত্র।সময় লাগবে।

এ ঘটনা যখন ঘটেছে তখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো।তবে সিসিটিভির ক্যামেরার সাহায্যে কোন একটা ক্লু পাওয়া যাবে বলে দাবি করছেন থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মো. ইকবাল।

টাইমনিউজবিডিকে তিনি বলছিলেন, আমাদের কাছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ রয়েছে।যেহেতু তার ব্যাপারে খারাপ কোন রিপোর্ট আমরা এখনও পর্যন্ত পাইনি।তাই সিসি ক্যামেরা এ ব্যাপারে আমাদের সহায়তা করবে।

তাছাড়া মামলার তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্ক তিনি বলেন, পুলিশসহ র‌্যাব, সিআইডি ও ডিবি সবাই এ মামলার তদন্ত কাজ করছে।এখনই তদন্ত সম্পর্ক কোন কিছু বলা যাবে না।তবে একটা প্রশ্ন আমার কাছে বারবার ঘুরপাক খচ্ছে।সেটা হলো ছিনতাইকারীরা টাকা বা জিনিসপত্র পাইলে চলে যায়।কিন্তু গুলি করবে কেন? তবে আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে এ মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে পারবো।

এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটের ‍দিকে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে ১০৩ সার্কুলার রোড এলাকায় আসলে একটি মটর সাইকেলে তিন জন দুর্বৃত্ত ওবায়দুলের মাথায় গুলি করে তার কাছে থাকা একটি ল্যাপটপ ও তিনটি মোবাইল সেট নিয়ে পালিয়ে যায়।

রিক্সা চালক মো. জাহাঙ্গির আলম স্থানীদের সহায়তায় থানায় নিয়ে গেলে থানা থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হামপাতালে (ঢমেক) নেওয়া হয়।পরে রাত ২টা ১৫ ‍মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ওবায়দুল।

এমআর, কেবি