নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন ধারার (নব্য জেএমবি) নেতারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমেই নারী সদস্যদের সংগ্রহ করছেন। অনলাইনে খোঁজ করে তাঁরা ধর্মভীরু শিক্ষিত তরুণীদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন।

জঙ্গি মতাদর্শ গ্রহণের পর তাঁরা নিজেদের ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে নারী সদস্যদের জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছেন। মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট অ্যাপস ডাউনলোড করে কার্যক্রম পরিচালনা করার কৌশলও শেখানো হয়েছে নারী জঙ্গিদের। ঢাকা ও গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার চার তরুণীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পেয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। ওই চার নারী জঙ্গিকে গতকাল বুধবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

র‌্যাব বলছে, গ্রেপ্তার নারী জঙ্গিদের দলে আরো অন্তত এক ডজন তরুণী আছে, যাদের মধ্যে ১০ জনের নাম পেয়েছে র‌্যাব। তারা হলো, সাফিয়া ওরফে সানজিদা ওরফে ঝিনুক, মাইমুনা ওরফে মাহমুদা ওরফে লায়লা, তাসনুবা ওরফে তাহিরা, সায়লা ওরফে শাহিদা, সালেহা ওরফে পুতুল, দিনাত জাহান ওরফে নওমী ওরফে বানী, তানজিলা ওরফে মুন্নী, আলিয়া ওরফে তিন্নি ওরফে তিতলী, মনিরা জাহান ওরফে মিলি ও ছাবিহা ওরফে মিতু। এই সন্দেহভাজন নারী জঙ্গিদের খুঁজছে র‌্যাব ও পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার চার নারী জঙ্গির মধ্যে আকলিমা রহমান মনি জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলীয় আমির মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসানের ফেসবুক আইডি থেকে ‘আল সাব্বির খান জাবিল’ নামে এক জেএমবি নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ‘ইসলামী ক্লাস ফর গার্লস পেজ’ এবং ‘ব্লাড রোজ’ নামের ফ্যান পেজ থেকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করত তারা। যেসব তরুণী জঙ্গিদের ‘মতাদর্শ’ গ্রহণ করে, তাদের মোবাইল ফোনে কয়েকটি অ্যাপস সরবরাহ করা হয়। এগুলোর মধ্যে ‘উম্মা তাওহিদ’ ও ‘আনসার ইসলামিয়া’ উল্লেখযোগ্য। ‘উম্মু জনদুল্লাহ হুরাইয়া’র মাধ্যমে থ্রিমা অ্যাপ ও একিউআইএস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তারা।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষিত তরুণীদের দলে ভেড়ানোর পাশাপাশি অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তাঁরা।

গ্রেপ্তারের পর ওই চার তরুণীর বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার রাতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। এ মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ নারী জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপারে তথ্য জানার চেষ্টা করছে।

তবে স্বজনরা দাবি করছে, গ্রেপ্তার তরুণীরা জঙ্গি নয়, তারা ধর্মভীরু। তারা পরিস্থিতির শিকার।

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার লুত্ফুল কবির জানান, গত ২১ জুলাই জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলীয় আমির মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসানকে টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর নারী জঙ্গি নেটওয়ার্কের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়। মাহমুদুলই নারী সদস্য সংগ্রহ করে ‘দাওয়াত’ এবং অর্থ তহবিল সংগ্রহ কাজে লাগাতেন। গত রমজানে আকলিমা জেএমবির জন্য ১২ হাজার টাকার একটি তহবিল সংগ্রহ করে দেয়। এই তথ্যের সূত্র ধরে দলটিকে শনাক্ত করা হয়েছে। এই দলে আর কেউ আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাহমুদুল প্রথমে আকলিমাকে আহলে হাদিস, হিযবুত তাহরীর এবং আইএস সম্পর্কে ধারণা দেন। তাকে কথিত ‘আইএস’-এ দলভুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেন। জেএমবির মতাদর্শ গ্রহণের পর মাহমুদুলের ফেসবুক আইডি থেকে সে জেএমবি নেতা ‘আল সাব্বির খান জাবিলের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। আকলিমা নিজে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে ইসতিসনাত আক্তার ঐশী, খাদিজা পারভীন মেঘলা ও ইশরাত জাহান মৌসুমিকে বিস্তারিত ধারণা দেয়। দলটি বিভিন্ন নামে মোবাইল অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। অ্যাপসের মধ্যে ‘উম্মা তাওহিদ’ ও ‘আনসার ইসলামিয়া’ উল্লেখযোগ্য।

র‌্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, আকলিমাসহ চারজনের মোবাইল ফোন থেকে জঙ্গি অ্যাপসের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মাধ্যমে ধর্মভীরু অনেক তরুণীও জঙ্গিবাদের প্ররোচনায় পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান করছেন র‌্যাবের গোয়েন্দারা।

র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত রবিবার গভীর রাতে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আকলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্য তিন নারীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের মধ্যে সোমবার সকালে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঐশীকে এবং রাতে মিরপুর ১ নম্বরের জনতা হাউজিং এলাকা থেকে মৌসুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই রাতে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে মেঘলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঐশী তিন বছর ধরে, মৌসুমি ও মেঘলা সাত মাস ধরে জিহাদি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব-৪-এর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো. আলাউদ্দিন মিয়া বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ওই মামলা করেন। তাতে গ্রেপ্তার চার তরুণী ছাড়াও ওই ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। আরো কয়েকজন নারী সদস্যও এই দলে আছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

আদালত প্রতিবেদক এম এ জলিল উজ্জ্বল জানান, মিরপুর মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (অপারেশন) শাহজালাল আলম গতকাল আসামিদের চার তরুণীকে আদালতে হাজির করেন। তিনি প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে আসামিদের ১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান। ঢাকা মহানগর হাকিম প্রণব কুমার আসামিদের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, রিমান্ডে থাকা চার তরুণীর মধ্যে আকলিমা, মৌসুমি ও মেঘলা মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী। ঐশী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে গত জুন থেকে ইন্টার্ন করছে। আকলিমা নতুন ধারার জেএমবির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। ঐশী সংগঠক।

মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী আকলিমার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বুরঙ্গি এলাকায়। গাজীপুরের জয়দেবপুরের উত্তর খাইলকুরে থাকত সে। প্রায় এক বছর আগে আনসার আলী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তার পরিচয় হয় মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। মাহমুদুল তাকে আহলে হাদিস, হিযবুত তাহরীর আইএস সম্পর্কে ধারণা দেন। আকলিমাকে কথিত ‘আইএস’-এ দলভুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেওয়া হয়। মাহমুদুলের ফেসবুক আইডি থেকে সে ‘আল সাব্বির খান জাবিলের’ সঙ্গে যোগাযোগ করত।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ঐশীর গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার সিকসিমিল এলাকায়। ২০১৩ সালে ঐশী ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারে, ধানমণ্ডিতে একটি বাসায় ‘ইসলামী ক্লাস’ হয়। সে ওই ক্লাসে যেত। সেখানে ক্লাস নিত পাকিস্তানের নাগরিক শাহপুর নামের এক নারী। তার পাশাপাশি আমিনা নামের এক বাংলাদেশি নারীও ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণীদের মগজ ধোলাই করত।

ঐশীর বাবা বিশ্বাস আক্তার হোসেনও ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসক। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ে জঙ্গি নয়। সে ধর্মভীরু। ফেসবুকে এক বান্ধবীর মাধ্যমে অসহায়দের সহায়তা করে। এতেই সে না জেনে ফেঁসে গেছে।’

মৌসুমির গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিলবিলাসে। পরিবারের সঙ্গে সে মিরপুরে জনতা হাউজিংয়ে ৪ নম্বর গেটের কাছে থাকত সে। সৌদিপ্রবাসী আবদুল আজিজ ও জিয়াউর রহমান নামের দুই ব্যক্তির কাছে আরবি ভাষা শিখেছে মৌসুমি। ‘আত-তামকিন’ লিংকের মাধ্যমে সে কথিত আইএসের খিলাফতসংক্রান্ত বয়ান শুনত।

২০১৩ সালে এইচএসসি পাসের পরই মেঘলার বিয়ে হয়। তার বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতীর বেলতৈলী গ্রামে। ‘ব্লাড রোজ’ নামে একটি গ্রুপের মাধ্যমে মেঘলা, আকলিমা, শহিদুল্লাহ, মৌসুমি ও তাদের বন্ধুবান্ধব ‘নবুওয়াতের আদলে খিলাফত’ ও একজন খলিফা কিভাবে মুসলিম উম্মাহ শাসন করবেন এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করত।

এসএ/ টাইম