চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ঘিরে রহস্যের জট খোলেনি এখনও। এ দু’জন হল ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব নুরুল আমিন।
মামলা ও তদন্তের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ দু’জন পলাতক। তাদের কোনো হদিস বের করতে পারেনি সিআইডি। এমনকি দু’জনের অবস্থান কোথায়, বিশেষ করে নুরুল আমিন কি দেশে আÍগোপন করে আছেন; নাকি বিদেশে পালিয়েছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা।
অথচ দশ ট্রাক অস্ত্র চালান আনার পর সিইউএফএল জেটিঘাটে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে খালাস কাজ তদারকি করেছিলেন পরেশ ও আমিন।
ঘটনাস্থল থেকে সেই যে তারা সটকে পড়েন, আজ পর্যন্ত তাদের অন্তর্ধান রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। ফলে সরাসরি অস্ত্র খালাসকাজ তত্ত্বাবধানকারী এই দু’জনের কাছ থেকে জানা গেল না ঘটনার পেছনের ঘটনা।      
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় ২০১০ সালে তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি ও ক্রোকি পরোয়ানা জারি করেন।
তবে তাদের গ্রেফতার দূরে থাক, অবস্থান পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি ও পুলিশ। জানা যায়, ভারতের আসামরাজ্যের ভারাইগাঁও জেরাইছাকলি গ্রামে পরেশ বড়ুয়ার বাড়ি। তার পিতার নাম দ্বিজেন বড়ুয়া।
আর নুরুল আমিন ঢাকার মোহাম্মদপুরের শায়েস্তা খান রোডের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে। সিআইডি টিম তার বাসা ও শ্বশুরবাড়িতে একাধিকবার গিয়েও কোনো হদিস পায়নি। এমনকি আজ পর্যন্ত নুরুল আমিনের ছবি পর্যন্ত কেউ সংগ্রহ করতে পারেনি।
২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে সিইউএফএলর তৎকালীন সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মবিন হোসেন খান বলেছিলেন, অতিরিক্ত শিল্প সচিব নুরুল আমিন ঘটনার দিন ট্রেনে করে চট্টগ্রামে আসেন। রাতে তাকে সিইউএফএল গেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত পৌনে ২টার দিকে মবিন হোসেন খান জেটিঘাটে অস্ত্র খালাসের তথ্য পেয়ে সিইউএফএল এমডিকে ফোন দেন।
এমডি তাকে বলেন, ঘটনাস্থলে কর্ণফুলী থানার ওসি এবং পুলিশ ফোর্স আছে। ঘটনা জানার পরও এমডি মোহসীন উদ্দিন তালুকদার এবং জিএম কেএম এনামুল হক কাউকে ঘটনাস্থলে পাঠাননি, নিজেরাও যাননি। এমনকি ঘটনার পরদিনও তারা সেখানে যাননি। তাদের আচরণ ও কার্যকলাপে মনে হয়েছে, তারা উভয়ই ঘটনা সম্পর্কে পূর্ব থেকে জ্ঞাত ছিলেন।
২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষী হিসেবে দেয়া জবানবন্দিতে সাবেক শিল্প সচিব ড. শোয়েব আহমেদ বলেছিলেন, তিনি দেশে থাকা অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত সচিব পরিচয়ে অতিরিক্ত সচিব নুরুল আমিনের সিইউএফএল রেস্ট হাউসে অবস্থান, মন্ত্রণালয়কে কিছু না জানিয়ে কক্সবাজারে যাওয়াসহ নানা বিষয়ে আমিনের আচরণ ছিল রহস্যজনক। এরপর হঠাৎ করে আমাকে (ড. শোয়েব) বদলি করে কাদেরী সাহেবকে সচিব করা হল।
আবার তাকে বদলি করে আমিনকে পূর্ণ সচিব করা হল। এতে ধারণা হয়েছে, শিল্পমন্ত্রী এবং নুরুল আমিন দু’জনই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তৎপর ছিলেন। মামলার অন্যতম আসামি হাফিজুর রহমান তার জবানবন্দিতে পরেশ বড়ুয়ার তত্ত্বাবধানে উলফার জন্য এসব অস্ত্র, গোলাবারুদ আনা হয়েছিল বলে স্বীকার করেছিলেন।
অস্ত্র খালাসকালে পরেশ বড়ুয়া ‘জামান’ পরিচয়ে সিইউএফএল জেটিঘাটে উপস্থিত ছিলেন। অস্ত্র আনা থেকে শুরু করে পরিবহন সবই দেখভাল করেন পরেশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনার সঙ্গে পরেশ বড়ুয়া ও নুরুল আমিনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর দু’জনকে আটকের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের খোঁজ মেলেনি। তারা কোথায় আছেন তাও বের করা সম্ভব হয়নি। উলে­খ্য, এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ আসামির মধ্যে পরেশ ও আমিন ছাড়া বাকি ১২ জনই কারাগারে আছেন। ফাঁসির আদেশের পর এদের সবাইকে কনডেম সেলে রাখা হয়েছে।
[b]
ঢাকা, ৩ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)//ইএইচ[/b]