সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান এমপি’র বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুদকের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা হয়েছে।

সোমবার দুদকের উপ-পরিচালক খায়রুল হুদা প্রায় দীর্ঘ ৬ মাস অনুসন্ধান চালিয়ের এ প্রতিবেদন যাচাই বাছাইযের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেন।

জানা যায়, দুদকের অনুসন্ধানী টিম গত ফেব্রুয়ারি থেকে পটুয়াখালী জেলাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন অফিস দফতরে এবং সরেজমিন পরিদর্শন, স্থানীয় জেলা রেজিস্টার দপ্তর, সাব-রেজিস্ট্রি, ভূমি অফিস, ডাক বিভাগ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, স্টক এক্সচেঞ্জ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানিসহ ২৪টি উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেন।

জানা যায়, গত ১২ জানুয়ারি দুদকের নিয়মিত সভায় সাবেক ও বর্তমান ৭ মন্ত্রী, এমপি অস্বাভাবিক অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ওই ৭ জনের মধ্যে সাবেক প্রানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুববুর রহমান এমপিও রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মাহবুবুর রহমানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় উপ-পরিচালক খায়রুল হুদাকে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুদক কর্মকর্তা খায়রুল হুদা নোটিশ পাঠিয়ে মাহবুবুর রহমানকে দুদকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একই সঙ্গে তাদের সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ জারি করেন। কিন্তু নোটিশ হাতে পাবার আগেই মাহবুবের স্ত্রী প্রীতি হায়দার অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। তবে গত মার্চে সাবেক এ পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী দুদকে মাত্র প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন।

জানা যায়, মাহবুবুর রহমান ও প্রীতি হায়দারের ‘আন্ধার মানিক’ ও ‘গঙ্গামতি’ নাম দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকাকালে বেআইনীভাবে বাগিয়ে নেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের যত ঠিকাদারি কাজ। শুধু তাই নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি, অর্থ বরাদ্দ, ড্রেজিং না করেই বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন, কার্যাদেশ নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়া, নদীর নাব্যতা আনয়নের নামে কোনো কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেন এমন অভিযোগও উঠেছে।

জানা যায়, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমানের আগে মাত্র ২০ একর জমি ছিল। পরে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পযন্ত তিনি জমিগুলো ক্রয় করেন। কত টাকার জমি কিনেছেন তার মোট হিসেবে দুদক এখনো করেনি। তার জমির পরিমান ২ হাজার ৮৬৫ একর হয়েছে। ৯ম সংসদের হলফনামা অনুসারে ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ছাড়া তার আর কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ছিল না। আর মাহবুবের নিজের ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার ১১২ টাকার স্থাবর সম্পদ ছিল। কয়েক বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭২ টাকা।

২০০৮ সালের হলফনামায় ৭টি আয়ের উৎস খাতের মধ্যে তার একমাত্র আয় ছিল খণ্ডকালীন ‘রাখি’ মালামাল থেকে, যার পরিমাণ ছিল বছরে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ৫ বছরের ব্যবধানে তিনি এখন মৎস্য উৎপাদন ও বিক্রয়কারী। আর এ খাত থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া চাকরি থেকে তার বছরে আয় ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৭০০ টাকা। এখন তার স্ত্রীর নামেই ১ কোটি ২৬ লাখ ৭১ হাজার টাকার সম্পদ।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে,পটুয়াকালী জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাবেক এ পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর হিসেব কষে শেষ করা যাচ্ছে না। কারণ ধানী জমি, জলাশয়, ভিটে বাড়ি, ঘাট, বসতি-চোখে যা পড়তো-সবই তিনি নিয়েছেন। এরমধ্যে পটুয়াখালীর লতা চাপালি, ধানখালি, বাদুরতলী, ধুলাশ্বর, লেমুপাড়া, খেপু পাড়া, বাহের চরসহ সংলগ্ন সব মৌজার জমিই এখন তার।

মাহবুবুর রহমানের ক্রয়কৃত জমি ২ হাজার ৮৬৫ একর বলা হলেও মাঠ জরীপ করলে এর পরিমান সাড়ে ৩ হাজার একরের বেশি। ওই এলাকায় যতদূর চোখ যায় সবই সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর জমি। তিনি গত ৫ বছর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালেই এসব জমি ক্রয় করেন। শুধু তাইনয়, স্ত্রী প্রীতি হায়দারের নামেও ক্রয় করেছেন কয়েক শ’ একর জমি।

মাহবুবুর রহমানের ক্রয় করা মাত্র সাড়ে ৩০০ একর জমির ১৬৭টি সাফ কবলা দলিল এখন দুদকের হাতে। আমমোক্তার নামার মাধ্যমে মালিক হওয়া জমির ১৯টি দলিলও রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তা ৯ম এবং ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিলকৃত হলফনামা, সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা সম্পদের বিষয়ে সাবেক এ প্রতিমন্ত্রী এবং তার এপিএস শামীম আল সাইফুল সোহাগকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

ঢাকা, একে, ১৮ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর