শুধু একটি রহস্যময় হাসি দিয়েই সাধারণ মানুষের মনে এক অজানা আতংক ছড়িয়ে দিয়েছেন সিদ্ধিরগঞ্জে একসময়ের মুকুটহীন সম্রাট সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। দীর্ঘ ১৯ মাস পর নারায়ণগঞ্জের মাটিতে পা দিয়ে আদালত থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে চলে গেলেও এক ধরনের আতংকে ভুগছেন মামলার বাদীসহ নিহতের স্বজনরা।

বিশেষ করে নূরকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরপরই তার ক্যাডারদের অনেকেই প্রকাশ্যে আসায় এই আতংকের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি তাদের কয়েকজনকে শুক্রবার আদালত প্রাঙ্গণেও দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, সাত খুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আরেক পলাতক আসামি নূরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিলার সেলিমও সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থান করছেন। নূর হোসেনের সঙ্গেই তিনি (সেলিম) ভারতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে জামিন পেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গ্রেফতারের পর ভারতের কারাগারে বসেই সিদ্ধিরগঞ্জের হারানো সাম্রাজ্য দখলে নিতে ছক আঁকছিলেন একসময়ে ওই এলাকার মুকুটহীন সম্রাট নূর হোসেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর এরই মধ্যে এলাকায় ফিরে এসেছেন আপন ভাইসহ নূর বাহিনীর কমপক্ষে অর্ধশত ক্যাডার। এলাকার ডিস ক্যাবল ব্যবসার আধিপত্য নিতে এরই মধ্যে নূর হোসেনের আপন ভাতিজা কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের বাহিনী এলাকায় নানা তৎপরতা শুরু করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাত খুনের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নূর হোসেনের বাড়ির দারোয়ান, ড্রাইভার, কাজের লোককে পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়। এতে আতংকিত হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান তার ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই। তবে কয়েক মাস আগে নূর হোসেনের শূন্য ওয়ার্ডে নির্বাচনে অংশ নিতে এলাকায় ফিরে আসেন তার একসময়ে সার্বক্ষণিক সঙ্গী আরিফুল হাসান।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নূরের সহযোগীরা এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের নামে ফের মহড়া দিতে শুরু করে। ওই নির্বাচনে হাসানের জয়ের মধ্য দিয়েই মূলত হারানো সাম্রাজ্য ফের দখলে নেন নূর হোসেন। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, নূর হোসেনের বড় ভাই ভয়ংকর সন্ত্রাসী নূরুজ্জামান জজ ওরফে ছোট মিয়াকে মাঝে-মধ্যেই এলাকায় আসতে দেখেছেন অনেকে। নূরের অপর ভাই নূর সালাম ওরফে বোবা ডাকাত, নূর উদ্দিন ওরফে নূরু মিয়া, ভাতিজা পরশ, রুবেল, সোহেল এলাকায় ফিরে এসে প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গডফাদার নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সন্ত্রাসী সালাউদ্দিন, ফয়েজ মেম্বার, হুমায়ুন কবির, আয়নাল হোসেন ওরফে হাক্কা, মোসলেম উদ্দিন ওরফে সেলিম, শামীম, কালা সেলিম, ফারুক মিয়া, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার, তাজুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, সাজ্জাদ আলম, ইসমাইল হোসেন, জিতু, মিজানুর রহমান, তানজিল, আসাব উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, জসিম, সাজু, দুলাল ও উপদেষ্টা সাদেকুর রহমান, তাজিব বাবু এরই মধ্যে এলাকায় ফিরেছেন।

শুক্রবার নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির করার সময় এদের অনেকেই আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন। দূর থেকে তারা নূর হোসেনকে দেখেছেন। আবার কেউ কেউ কাছাকাছি এসে নূর হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণেরও চেষ্টা করেছেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার পর নূর হোসেন পালিয়ে গেলে তারাও গা-ঢাকা দেন। ওই সময় নূর হোসেনের সহযোগী হিসেবে এদের অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে আটকের জন্য পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে। তবে তখন তাদের এলাকায় পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, গত দেড় বছরে আমরা বেশ শান্তিতেই ছিলাম। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পরিত্যক্ত কোনো মিলে রাতভর কোনো মানুষের আর্তনাদ শোনা যেত না কিংবা বহুতল ভবন নির্মাণ করতে ভয় পেতেন না এলাকার লোকজন। ট্রাক স্ট্যান্ডে কাউন্টার বসিয়ে মাদকের ব্যবসা ছিল না, ছিল না পরিবহনে ওপেন চাঁদাবাজি। ওই নেতা জানান, চলতি মাসেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নূর হোসেনের ভাতিজা (স্থানীয় কাউন্সিলর) শাহজালাল বাদল অপর এক আওয়ামী লীগ নেতার ওপর হামলা চালিয়েছেন। এই ঘটনায় মামলার পরও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাদল।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেছেন, নূর হোসেনের একসময়ের ঘনিষ্ঠ এসব সহযোগী এলাকায় ফিরে বেহাত হয়ে যাওয়া অবৈধ সাম্রাজ্য দখল ও পরিবহন সেক্টরসহ বিভিন্ন চাঁদাবাজির উৎস নিয়ন্ত্রণ নিতে পাঁয়তারা শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর দাবি, এসব সন্ত্রাসী মাঝেমধ্যেই এলাকায় মহড়া দিয়ে আতংক সৃষ্টি করছে।

এ ব্যাপারে সাত খুন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, নূর হোসেনের ভাইয়েরা এলাকায় ফিরেছে কিনা এমন কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে তারা তো আর মামলার আসামি নয়। যদি স্থানীয় থানায় কোনো মামলা থেকে থাকে তবে সেটা ওই থানাকে বলেন। নূর হোসেনের ভাই ও ক্যাডারদের এলাকায় ফিরে আসার ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি সরাফত হোসেন জানান, মামলা থাকলে এলাকায় ফিরে আসার প্রশ্নই আসে না। আর যদি কেউ মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় আসে বা আইন-শৃংখলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে তবে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।

নিরাপত্তাহীনতায় বাদীসহ নিহতের স্বজনরা : পুলিশি নিরাপত্তা তুলে নেয়ায় গভীর শংকায় ভুগছেন সাত খুন মামলার বাদী ও নিহত নজরুলের স্ত্রী (কাউন্সিলর) সেলিনা ইসলাম বিউটি। রোববার তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতায় বিশেষ করে চার্জশিট থেকে বাদ পড়া আসামিরা এলাকায় ফিরেই নানা হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি তিনি পুলিশকেও একাধিকবার বলেছেন। এর পরও সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিত উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে নিহত নজরুলের পরিবারকে সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশি নিরাপত্তা দিয়েছে। তবে লোকবলের অভাবে এখন সার্বক্ষণিকভাবে সেটা সম্ভব না হলেও প্রতিনিয়তই আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তাছাড়া সাদা পোশাকের পুলিশও নজরদারি করছে।

কিলার সেলিম বাংলাদেশে : লোমহর্ষক সাত খুন মামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম ওরফে কিলার সেলিম এখন বাংলাদেশে। ভারতে নূর হোসেনের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী সেখানকার আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েই ফিরে এসেছে নিজ এলাকায়। এমনকি গত কোরবানির ঈদের দিনও নিজ এলাকা বন্দরের কুড়িপাড়ায় সেলিমকে দেখেছেন এলাকার লোকজন। সাত খুনের ঘটনার পর আইন-শৃংখলা বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে বিমানেই ভারতে গিয়েছিল নূর হোসেনের অন্যতম প্রধান এই সহযোগী। অভিযোগ রয়েছে, সেলিমকে গ্রেফতারের সুযোগ থাকলেও তাকে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। জানা গেছে, এরই মধ্যে সেলিমের বিরুদ্ধে উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলা দায়রা আদালত হুলিয়া জারি করেছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী ও বহু অপকর্মের হোতা সেলিম ছিল নূরের অবৈধ বালু ব্যবসা, ভূমি দখল ও মাদক ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তাছাড়া কাঁচপুরের ল্যান্ডিং স্টেশনে নূরের জলসা মহলের প্রধান নিয়ন্ত্রকও ছিলেন এই সেলিম। ভারতের আদালত থেকে অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েই সেলিম বাংলাদেশে ফেরত চলে আসে। বন্দরের কুড়িপাড়া এলাকায় না থাকলেও প্রায়শই সে এলাকায় আসে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা ডিবি পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল জানিয়েছেন, সেলিমকে ওই সময় এবং তদন্তকালে একাধিকবার গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হয়েছিল কিন্তু সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সে দেশে ফিরেছে কিনা এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে যদি এমনটি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। সুত্র: যুগান্তর

এমএইচ