দুর্ণীতি আর লুটপাটের মধ্য দিয়ে চলছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের কার্যক্রম। চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে কর্মচারী, সর্বত্র চলছে দুর্নীতির এই মহোৎসব।

অর্ধশতাধিক দূর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ । যা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দৈনিক সমূহে প্রকাশিত হয়েছে।

এবার বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি রজব আলীর বিরুদ্ধে।

কর্মচারি ইউনিয়ন সভাপতি রজব আলী কারিগরি বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ-লাখ টাকা। তার প্রতিটি তদবির ফি. ছিল ১ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমানের পর এবার এই রজব আলীর বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃস্টি করেছে সর্বত্র।

রজব আলীর কারিগরি বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতি: নবম শ্রেণির বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষার শিক্ষার্থীরা ফরম ফিলাপ করেনি, পরীক্ষায় অংশও নেয়নি। কেন্দ্রে তাদের কোনো হাজিরা সিট বা পরীক্ষা দেয়ার চিহ্নও নেই।

তারপরও তারা চলতি বছর এসএসসি (ভোক) ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। রেজাল্টও বের হয়। তাদের এসএসসির ফলাফলে এফ-৯ দেখানো হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সেই রিপ্লেস জালিয়াতির কারণে।

এমন অনেকের মধ্যে ছয়জন ছাত্রের তালিকা, মার্কশীট টাইমনিউজবিডির এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

সূত্র মতে, রজব আলীর নেতৃত্বে কারিগরি বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতিতে সক্রিয় একটি চক্র। এ চক্র ভুয়া নামে রেজিস্ট্রেশন করে রাখে। এসএসসির সার্টিফিকেট প্রয়োজন এমন লোকজনের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়।

পরে তাদেরই করা ভুয়া রেজিস্ট্রেশনে রিপ্লেস করে বর্তমান ছাত্রদের নাম বসিয়ে দেয়া হয়। এ ছয়জনের নবম শ্রেণির ভুয়া রোল হলো-৬৬২৮৪৭, ৭৫৮৭৫৮, ৬৬২৮৯০, ৭৫৮৭৫৭, ৭৫৮৭৬২ ও ৭৫৮৮০৭। রেজিস্ট্রেশন নং হলো- ৫৫১১৮৫, ৮৯০২২৭, ৫৫১১৭২, ৮৯০২২৬, ৮৯০২৩৩ ও ৮৯০২৩২। প্রত্যেকেরই সেশন ২০১৪। আর তাদের এসএসসি ২০১৬ এর রোল হলো- ৬৬২৮৪৭, ৭৫৮৭৫৮, ৬৬২৮৯০, ৭৫৮৭৫৭, ৭৫৮৭৬২ ও ৭৫৮৮০৭।

অবাক করা বিষয় হলো এরা প্রত্যেকেই ছাত্র হলেও তাদের রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস করতে গিয়ে একটি মহিলা মাদরাসার নামে করা হয়েছে। এটি হলো পাবনার বেড়া মহিলা ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা। এসএসসিতে ৭৫৮৭৫৮ রোলধারীর নাম আমির হামজা। তার পিতার নাম ওয়াজেদ আলী। মাতা মোছা জামিলা খাতুন। তার গ্রুপ দেখানো হয়েছে কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাকে রেগুলার ছাত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে। রেজাল্টশীটে দেখা যায় আমির হামজা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং বিষয়ে এ প্লাস মার্ক পেয়েছে।

কম্পিউটার এপ্লিকেশন বিষয়েও পেয়েছে এ প্লাস মার্ক। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট ট্রেনিং ও পিজিক্যাল এডুকেশনেও পেয়েছে এ প্লাস মার্কস। আর ধর্ম, এগ্রিকালচার, বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কসহ অন্য বিষয়ে পেয়েছে এফ-৯।

রেজাল্টশীটে একই রোলধারী দেখানো হয়েছে কালাম হোসেন নামে একজনকে। তার পিতার নাম ওয়াজেদ আলী। মাতার নাম আমিনা বেগম। তার গ্রুপ দেখানো হয়েছে কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাকেও রেগুলার ছাত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে।

৭৫৮৭৬২ রোলধারীর নাম সুমন হোসাইন। তার পিতার নাম মুল্লুক চান। মাতার নাম শুকুরুন্নেসা। তাকেও একই গ্রুপ ও রেগুলার ছাত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে। সুমন হোসাইনকে ফেল দেখানো হয়েছে।

৬৬২৮৪৭ রোলধারীর নাম আশিক রাইমান। তার পিতার নাম দেখানো হয়েছে আমির হোসাইন। মাতার নাম জুলেখা খাতুন। সেও একই গ্রুপ থেকে পরীক্ষা দেয়। আশিক একটি বিষয়ে বি মাইনাস ও একটি বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছে। অন্য সব বিষয়ে তাকে দেখানো হয়েছে এফ-৯।

৬৬২৭৯০ রোলধারীর নাম আতিক হাসান। পিতা আমোদ আলী। মাতা আলো খাতুন। সেও একই গ্রুপ থেকে পরীক্ষা দেয়। আতিকও একটি বিষয়ে এ মাইনাস ও একটি বিষয়ে এ প্লাস মার্ক পেয়েছে। অন্য সব বিষয়ে এফ-৯ পেয়েছে।

যে প্রতিষ্ঠানের নামে তারা পরীক্ষা দিয়েছে সে প্রতিষ্ঠানের কোড নম্বর হলো-২৬১৩১। অভিযোগে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ওই চক্রটি নবম বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষার ভুয়া নম্বরপত্র তৈরি করে কম্পিউটার সেলে জমা দিয়েছে। এছাড়া অভিযোগে এ চক্রের হোতা হিসাবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের এই প্রভাবশালী নেতা রজব আলীকে দায়ী করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর একটি অভিযোগও জমা পড়েছে। গত পহেলা আগস্ট দেয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব ছাত্রের বর্তমান বয়স ৩৬ থেকে ৩৭ বছর।

বিষয়টি এখন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এখনি এসব চক্রের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভবিষ্যতে এর শিকড় অনেক গভীরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকই।
এ বিষয়ে টাইমনিউজবিডির প্রতিবেদক এস আলম বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারি ইউনিয়ন সভাপতি রজব আলীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে, তিনি বিষটি সম্পুর্ণ অস্বীকার করে বলেন, এসব বিষয়ে তিনি জড়িত নন। তার বিরুদ্ধে একটি চক্র মিথ্যা এবং বানোয়াট তথ্যের মাধ্যমে গভীড় ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি আরো বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিপক্ষরা আমার ইমেজ নষ্ট করতে এসব করা হতে পারে।

এসএম