পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারীদের উপর চিহ্নিত উচ্ছৃঙ্খল বখাটে যুবকদের হামলা ও শ্লীলতাহানীর তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে নারী অধিকার আন্দোলন।

সোমবার সংগঠনের সভানেত্রী ভাষাসৈনিক প্রফেসর চেমন আরা এবং সেক্রেটারি প্রফেসর ডা. হাবীবা আক্তার চৌধুরি স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানানো হয়।

বিবৃতিতে নেত্রীদ্বয় বলেন, বাংলা নববর্ষের দিনে নারী নির্যাতনের এই ঘটনা জাতীয় জীবনের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের রচনা করেছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে নারীর উপর নির্যাতনের এই ঘটনা নারীর অধিকারকে করেছে ভূ-লুন্ঠিত, জাতির শতবর্ষের ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত।

১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে নববর্ষের দিনে নারী লাঞ্ছনার এই ঘটনা। এই নির্মম ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র প্রচার-প্রকাশ করা হয়েছে যার মাধ্যমে নারী নির্যাতনের জড়িত যুবকরা চিহ্নিতও হয়েছে।

কিন্তু ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে না পারা ও পুলিশের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা দুঃখজনক।

এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত উচ্ছৃঙ্খল বখাটে যুবকদের ছাত্রজনতা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পর পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। ফুটেজের মাধ্যমে এবং পুলিশের এই আচরণে নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে সরকারী দলের ছাত্রসংগঠনের সংশ্লিষ্টা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

দেশের জনগণও এ সব উচ্ছৃঙ্খল এবং সন্ত্রাসীদের পরিচয় জানে। নিতান্তই সরকাদী দলের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের দলীয় কর্মীদের দিয়ে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে যা বাংলাদেশের শতবছরের মুসলিম পরিচয় ও সংস্কৃতির ওপর নির্মম আঘাত। এর আগেও, ১৯৯৯ সালের থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনকালে এক তরুণীকে একই ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিলো।

সেই সময়ের ক্ষমতাশীন দলই বর্তমানের ক্ষমতায় রয়েছে এবং সে সময়ের ঘটনায়ও চিহ্নিত যুবকরা ক্ষমতাশীন দলেরই কর্মী ছিলো। তখন এই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক জনস্বার্থমূলক মামলা (মামলা নং ২১২/২০০০) দায়েরের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ নারীর শালীনতাহানীমূলক কর্মকাণ্ডসহ ঢাকা বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আইনবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধে পুলিশসহ সরকারের প্রতি বেশকিছু নির্দেশনা প্রদান করে, যার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন অদ্যাবধি হয়নি।

নেত্রীদ্বয় লজ্জাজনক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ এবং ধিক্কার জানিয়ে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান।

নেত্রীদ্বয় আরো বলেন, নববর্ষের দিনে কেবল তরুনীদেরই শ্লীলতাহানী করা হয়নি, মানুষরূপী পশুদের নারকীয় তান্ডব থেকে রক্ষা পায়নি মায়েরাও, শিশুসন্তানের সামনেই মাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থেকে তামাশা দেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি পাঁচ বখাটেকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে সারাদেশে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে সিদ্ধহস্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মা-বোনদের উপর নির্যাতনকারী সন্ত্রাসীদের এভাবে ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে তাদের ভূমিকাকে জাতির সামনে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে জানানো হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, পুলিশ তার কথা শোনে না। কোন সুস্থ্য ও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এ ধরণের ভূমিকা প্রত্যাশিত নয়।

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলের নেতা নারী, স্পীকার নারী সে দেশে নারীর উপর এই অত্যাচার মেনে নেয়া যায় না। দেশের সর্বচ্চো বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বারবার নারী লাঞ্ছনার ঘটনা সারা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশী জাতির মান-মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

নারী অধিকারের নামে নারীকে ভোগবাদী পণ্যে পরিণত করার হীন চেষ্ঠায় তৎপর তথাকথিত নারীবাদী সংগঠনগুলোর রহস্যজনক নিরবতা দুঃখজনক ও হতাশাজনক। ইসলামের শাশ্বত নারী অধিকারের বিরুদ্ধে সারাবছর সরব থাকলেও তারা এখন এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি।

সেই সঙ্গে এসব দুষ্কৃতিকারী, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের পরিবর্তে উল্টো নির্যাতনের ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তৎপরতা চালাচ্ছে সয়ং পুলিশ। নববর্ষের দিনে কোন নারীর বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবী করছে ডিএমপি। যেখানে ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে সারাদেশের জনগণ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেখানে নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে পুলিশের এমন মিথ্যাচার পুরো জাতিকে হতবাক করেছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সরকারী দলের কিছু মন্ত্রী-এমপি এই ঘটনায় জঙ্গিবাদের ধোয়া তোলার মাধ্যমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার অপচেষ্টা করছেন। যারা এই লজ্জাজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত জাতির সামনে তাদের পরিচয় আজ উন্মোচিত।

জাহাঙ্গিরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনায় জড়িত সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের বেশ কিছু কর্মীদের বহিষ্কারও করেছে। সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন থেকেও তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু লোক দেখানো এই শাস্তিই বর্বর এই ঘটনায় জড়িত নরপশুদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না।

তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যাতে ভবীষ্যতে জাতির ইতিহাসে এমন কালিমা লেপনের দুঃসাহস কেউ না দেখায়। সেই সঙ্গে অসহায় নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ পুলিশ সদস্যদেরও বিচার করতে হবে। যে প্রক্টর ক্যাম্পাসে তার ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, যার কথা পুলিশ শোনে না এমন নিষ্কর্মা প্রক্টরের অপসারণ করতে হবে।

সর্বোপরি, এই ঘৃণ্য ঘটনায় জড়িত যুবকরা কোন দলের রাজনীতির সাথে জড়িত, কাদের ছত্রছায়ায় তারা পরিচালিত হয়, কোন পরিচয়ের কারনে পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে তা আজ জাতির সামনে সুষ্পষ্ট।

এই ঘটনার জন্য সরকারের দায়বদ্ধতা সুস্পষ্ট। বিবৃতিতে নেত্রীদ্বয় জাতির ইতিহাসে এই ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক ঘটনায় দোষিদের বিচারের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যকর ও বাস্তবমূখী আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এসএইচ