দীর্ঘ ৯ বছর অতিবাহিত হলেও শেষ হয়নি জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চালানো সিরিজ বোমা হামলার বিচারকাজ। শীর্ষ ৬ জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর হলেও অন্য কারো ফাঁসি কার্যকর হয়নি।
অপরদিকে, বিচারের অপেক্ষায় থেকেও হামলার অধিকাংশ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন নিহতের স্বজনরা। ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশের ৬৩ জেলার ৫শ স্পটে একযোগে ৫ শতাধিক বোমা হামলার ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৪ শতাধিক মানুষ।
জেএমবি কর্তৃক সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া ৩২২ মামলার মধ্যে ২৮৯টির চাজর্শীট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০২টি মামলার বিচারে ৩৫ জঙ্গিকে মৃত্যুদন্ড, ১৩১ জনকে যাবজ্জীবন ও ১৮৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিচারাধীন রয়েছে আরো ১৭৪টি মামলা। চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে ২৫টির। বাকি মামলাগুলো এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ(জেএমবি)। জেএমবি আগে থেকে শক্তি সঞ্চয় করলেও স্বরুপে প্রকাশ্যে আসে ১৭ আগস্ট। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের পর থেকে আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে জেএমবির আত্মঘাতী জঙ্গি স্কোয়াড। তাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয় দেশের বিচার বিভাগ।
এরপর মোট ৩৮টি অপারেশন চালায় জেএমবি। এসব হামলায় ৩৩ জন নিহত হয়। আদালত অঙ্গনসহ একের পর এক হামলা চলে বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের উপর।
এসব ঘটনায় গুরুতর আহত হন ৪ শতাধিক নিরীহ মানুষ। ভুক্তভোগীরা এখনো বিচারের আশায় দিন গুনছেন। কিন্তু টানা ৯ বছরেও এই ঘটনার সব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা হতাশ। শীর্ষ ৬ জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরে আর কারো ফাঁসি কার্যকর হয়নি।
২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারক সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে হত্যার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে। ওইসময় বোমা হামলাকারী জেএমবি সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন হাতে-নাতে ধরা পড়ে। এ দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ ৭ জনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে আল-মামুন ছাড়া বাকি ৬ জনের মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
দন্ডপ্রাপ্তদের স্বজনরা কে কোথায়
ফাঁসির দন্ড কার্যকর হওয়া ৬ জনের মধ্যে শায়খ আব্দুর রহমানের ছেলে নাবিল রহমান কুমিল্লা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের স্ত্রী ফাহিমা খাতুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে রাজশাহীর নওদাপাড়ায় অবস্থান করছেন।
বাংলা ভাইয়ের তিন বছরের ছেলে সাদকে আদালতের নির্দেশে তার নানির হেফাজতে দেয়া হয়েছে। শায়খ আব্দুর রহমানের স্ত্রী নূরজাহান বেগম জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর রাজশাহীর নওদাপাড়ায় চলে গেছেন।
আব্দুল আউয়ালের স্ত্রী আফিফা বেগম তার শ্বশুরবাড়িতে থাকছেন। আফিফা শায়খ আব্দুর রহমানের মেয়ে। তার তালহা নামে তিন বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। শায়খ আব্দুর রহমানের দুই ছেলে মাহমুদ রহমান (১৭) ও ফুয়াদ রহমান (১৩) ময়মনসিংহ আকুয়া দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। তার আরেক ছেলে আহম্মদ রহমান (৬) মায়ের সঙ্গে রাজশাহীতে থাকে।
উত্তরায় কুশল সেন্টারে নিচতলায় শায়খ আব্দুর রহমানের দুটি দোকান রয়েছে। ক্রয় সূত্রে পাওয়া এই দুই দোকানের মাসিক ভাড়া বাবদ সাড়ে ৫ হাজার টাকা পাচ্ছেন তার পরিবার। এছাড়া শায়খ আব্দুর রহমানের জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে কয়েক বিঘা জমি আছে। সে জমি থেকে আয়কৃত টাকা দিয়ে তাদের সংসার চলে।
ফাঁসি কার্যকর হওয়া শায়খ আব্দুর রহমানের ছোট ভাই আতাউর রহমান সানি ছিলেন অবিবাহিত। জেএমবি নেতা ফারুক হোসেন ওরফে খালেদ সাইফুল্লাহর স্ত্রী থাকলেও তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রীর খোঁজখবর কেউ রাখেননি।
এদিকে, পিরোজপুরের কাউখালীর গোয়ালতা গ্রামের তফাজ্জেবান মঞ্জিলে খালেদ সাইফুল্লাহর দুই ভাই বেলায়েত খান ও এনায়েত খান থাকেন। তারা কৃষিকাজ করে সংসার চালান। এদের আরেক ভাই জাকির খান ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত।
ফাঁসি কার্যকর হওয়া ইফতেখার হাসান আল-মামুনের বাড়ি রাজশাহীর মতিহারের দাশমারিতে। তার পিতা কামরুজ্জামান একজন দিনমজুর। বর্তমানে মামুনের বাবা ও মা তাদের অপর তিন সন্তানকে নিয়ে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ফাঁসির দন্ড থেকে বাঁচতে ৩৫ জঙ্গির আপিল
ফাঁসির দন্ড থেকে বাঁচতে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন জেএমবির ৩৫ জঙ্গি। আদালত সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ আদালতে আবেদনকারীরা হলেন, হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান ওরফে হায়দার, নারায়ণগঞ্জের সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে সজিব, নওগাঁর নিয়ামতপুরের আবদুল কাইউম, বগুড়ার শেরপুরের হাফেজ মিনহাজুল ইসলাম ওরফে সোহেল রানা ওরফে সানোয়ার হোসেন, জামালপুরের আক্তারুজ্জামান, খুলনার তরিকুল ইসলাম ওরফে রিংকু, ঝিনাইদহের মনিরুল ইসলাম ওরফে মোকলেছ, নাসরুল্লাহ ওরফে শান্ত, রোকনুজ্জামান ওরফে সিবুন, গাইবান্ধার মতিন মেহেদী ওরফে মতিনুর ইসলাম, গাইবান্ধার আবু তালেব আনছারী ওরফে বাবুল আনছারী, ঝিনাইদহের মোহন, মামুনুর রশিদ, মুহিদ আহম্মদ, মোজাম্মেল হক ওরফে মোজাম, তুহিন রেজা, সবুজ আলী, শৈলকূপার ফারুক হুসাইন, ঝিনাইদহের মহিরুল আল মামুন ওরফে চাঁদ, ঝিনাইদহের বিল্লাল হোসেন, সাবউদ্দিন, শৈলকূপার রবজেল হোসেন এবং আজিজুর রহমানসহ আরো ৬ জন।
ফিল্মি স্টাইলে তিন জঙ্গি ছিনতাই
ফিল্মি স্টাইলে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে সাজাপ্রাপ্ত ৩ জেএমবি সদস্যকে ছিনতাই করে অপর জঙ্গি সদস্যরা। ২৩ ফেব্রুয়ারি রোববার সকাল সোয়া ১০টায় ময়মনসিংহের ত্রিশালে এ ঘটনা ঘটে।
ছিনতাইকৃত আসামিরা হলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন, রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বোমারু মিজান।
অবশ্য ছিনতাইয়ের ৭ ঘণ্টার মাথায় টাঙ্গাইল থেকে জঙ্গি সদস্য রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকি দু’জনের খোঁজ মেলেনি। জঙ্গি ছিনতাইয়ে সহযোগিতার অভিযোগে রাতে গাজীপুর থেকে আটক জাকারিয়ার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করেছে পুলিশ।
এ ঘটনার পর সীমান্ত ও দেশের সব কারাগারে রেড এলার্ট জারি করা হয়। দায়িত্বে অবহেলার কারণে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজ ও অন্যজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
জঙ্গি ছিনতাইকারীদের এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমার আঘাতে আতিকুর রহমান (৩২) নামে পুলিশের এক কনস্টেবল নিহত ও দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। গুলিবিদ্ধ এসআই হাবিবুর রহমান (৫০) ও সোহেল রানা (৩০)।
ঘটনার পর পালানোর সময় টাঙ্গাইলের সখিপুর থেকে জাকারিয়া নামের এক জেএমবি’র সদস্যকে অস্ত্র ও ব্যবহৃত গাড়িসহ আটক করে পুলিশ। অপরদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামিকে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার ৭ ঘণ্টা পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাফেজ রাকিব হাসানকে টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার তক্তারচালা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওই ঘটনার পরেরদিন রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ নিহত হয়। এখনো পলাতক রয়েছে সালেহীন ও বোমারু মিজান।
এ ঘটনায় পলাতক আসামিদের ধরিয়ে দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, জঙ্গি সংগঠন জেএমবি' র বড় ধরনের আরও কোনো নাশকতা চালানোর মতো ক্ষমতা নেই। তবে আশংকার জায়গা থেকে দেশের কয়েকটি এলাকায় জেএমবি সদস্যরা নাশকতা চালাতে পারে।
র্যা বের নিজস্ব গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এই হামলা হতে পারে। এসব এলাকায় র্যা বের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
খুব শিগগিরই সংগঠনটির সকল নেতাকর্মীকে আটক করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা, জেইউ, ১৬ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি,কেএ





