নাসির হোসেন ওরফে নাসির হাওলাদার ওরফে নাসির উদ্দিন ওরফে র্যাব নাসির। বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার বড় মাছুয়ায়। গত বছরের ২৫ জুলাই মঠবাড়িয়ায় জঙ্গিবিরোধী মিছিলে তার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে হামলা চালানো হয়। এতে যুবলীগ নেতা ইলিয়াস হোসেন ওরফে পণ্ডিত লিটন নিহত হন।
গুলিবিদ্ধ হন আরও ১০-১২ জন। পরদিন ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এ মামলায় মঠবাড়িয়া থানা পুলিশ তাকে ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে। পরে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় করা মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের একটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। সোমবার তিনি আদালত থেকে জামিন পান। এখন অন্য মামলায় তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানা, জয়দেবপুর এবং দারুস সালাম থানাসহ বেশ কয়েকটি থানায় অন্তত ১৫টি মামলা আছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এভাবে নাসিরের মতো বিভিন্ন বাহিনীর অনেক চাকরিচ্যুত সদস্য জড়িয়েছেন নানা অপরাধে। অপরাধে যুক্ত হওয়ার অভিযোগেই সংশ্লিষ্ট বাহিনী থেকে তাদের চাকরি যায়। খেটেছেন জেল। জামিনে বের হয়ে তারা ফের লিপ্ত হন ভয়াবহ অপরাধ কর্মকাণ্ডে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়ে তল্লাশির নামে তারা মানুষের টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেন। কখনও আটক বা গ্রেফতারের নামে তারা লোকজনকে গাড়িতে তুলে গোপন আস্তানায় নিয়ে যান। পরে অপহৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেন। কারও কারও বিরুদ্ধে রয়েছে অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ। পুলিশ বা র্যাব পরিচয়ে চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া করছেন ছিনতাই-ডাকাতি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এ মুহূর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাবেক অন্তত ১০ জন সদস্য পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড। নাসির ছাড়া অন্যরা হলেন : মনোয়ার হোসেন ওরফে মনা, গোলাম মাস্তফা শাহীন ওরফে পুলিশ শাহীন, আনিচুর রহমান ওরফে আনিচ, নূর ইসলাম, আবদুল গফুর, গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী, আশরাফ, লুৎফুর রহমান ও আবদুস সামাদ।
জানা যায়, নাসির ২০০০ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। ২০১১ সালে রাজধানীর গাবতলীতে র্যাবের গাড়িতে করে ৬০০ বোতল ফেনসিডিল বহনের সময় র্যাবের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এ ঘটনায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় ছয় মাস জেল খাটার পর হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। গড়ে তোলেন অপরাধ সাম্রাজ্য। গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তার মালিকানাধীন মিরপুরের হোটেল চৌধুরী ইন্টারন্যাশনাল থেকে নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর নাসির সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক এবং অসামাজিক কাজে জড়িত থাকাসহ নানা অভিযোগে রাজধানী ও এর বাইরের বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলায় আছে। একাধিক মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি নাসির। সব মামলার তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে চিঠি দেয়া হয়েছে। ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মিরপুর মডেল থানায় করা একটি মাদক মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। ৬ জুলাই মিরপুর মডেল থানায় করা অপর মামলায় নাসিরের ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি আদালতে আবেদন জানানো হয়। এ বিষয়ে শুনানির তারিখ ছিল সোমবার। কিন্তু আদালত রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে জামিন দেন। শুনেছি তার পক্ষে অনেক বড় তদবির ছিল।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান জানান, সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য মনোয়ার হোসেন মনার গ্রামের বাড়ি ফেনী। তিনি একেক সময় রাজধানীর একেক এলাকায় থাকেন। কোনো বাসাতেই ২-৩ মাসের বেশি থাকেন না। নানা কায়দায় তরুণীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তিনি বাসা ভাড়া নেন। বিয়ে না করেই তাদেরকে তার বাসায় ওঠান। পরে তিনি তরুণীদের দেহব্যবসায় বাধ্য করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর ৭৯/বি/৪ নম্বর বিবির বাগিচার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। প্রায় তিন মাস আগে রেহেনা বেগমকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে জিন্দাবাহার দ্বিতীয় লেনের ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে তোলেন মনা। পরে রেহেনাকে দিয়ে দেহব্যবসা শুরু করান তিনি। এ অভিযোগে যাত্রাবাড়ী থানার এসআই কেএম আজিজুল হকের নেতৃত্বে একটি টিম ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এ সময় মনা পালিয়ে যান। মনাকে ধরতে অভিযান চলছে।
গোলাম মোস্তফা শাহীন ১৯৯৩ সালে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন পুলিশে। অবৈধ অস্ত্র বহন, চেক জালিয়াতি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগে ২০০০ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি হারানোর পর তিনি তৈরি করেন ডাকাত দল ও ছিনতাই পার্টি। অপরাধ জগতে তিনি ‘পুলিশ শাহীন’ হিসেবে পরিচিত। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে ২০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন। জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
রাজধানীর কাফরুল থানায় কর্মরত থাকা অবস্থায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয় পুলিশের এএসআই আনিচুর রহমান আনিচকে। ২০১৫ সালের ১১ জুন চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় পুলিশের নায়েক নূর ইসলামকে। পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়। ২০১৫ সালের বছরের ২৮ জুন রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় সেনাবাহিনীর সাবেক ল্যান্স করপোরাল আবদুল গফুর এবং সাবেক সার্জেন্ট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরীকে। ওই বছরের ২৫ জুন আদাবর থেকে মোখলেসুর রহমানকে অপহরণের পর ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিলেন তারা। হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় পুলিশের চাকরিচ্যুত এসআই আশরাফকে বিভিন্ন সময় আটক করা হয়েছে। লুৎফুর রহমান সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার নামে একটি লাইসেন্স করা পিস্তল রয়েছে। ওই অস্ত্র তিনি ব্যবহার করছেন অপরাধ কর্মকাণ্ডে। আবদুস সামাদ ২০০৫ সালে সেনাবাহিনীর সৈনিক পদ থেকে শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন। তিনি এখন ডিবি পরিচয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানতে চাইলে র্যাব মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘অপরাধীকে আমরা অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করছি। কে র্যাব ছিল বা কে পুলিশে ছিল সে বিষয়টি বিবেচনা করছি না। যার বিরুদ্ধে তথ্য পাচ্ছি তাকেই আমরা আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।’
একই ধরনের তথ্য জানিয়ে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, চাকরিতে থাকার সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের অপরাধীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। কোনো কারণে চাকরি হারানোর পর অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে মাঠে নামেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সাবেক সদস্যরা। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
মাহমুদ





