হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি না হওয়ায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর কারাগারগুলোর ‍‌'কনডেম সেলে'  প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। গত ১০ বছরে হাইকোর্টে সর্বমোট ৯৮৭টি ডেথ রেফারেন্স এসেছে। এর মধ্যে ৫১৫টি মামলার শুনানি শেষে ২৫৭টিতে খালাস এবং ১৯০টিতে ফাঁসির দণ্ড বহাল রয়েছে। ৭টিতে দণ্ড কমানো হয় এবং ৬১টি ডেথ রেফারেন্স পুনরায় শুনানির জন্য বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া হাইকোর্টে বর্তমানে ৯টি ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। সংশ্লিষ্ট সেকশনে ৩৮০টির পেপারবুক তৈরি করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বর্তমানে চলছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আসা ডেথ রেফারেন্সের শুনানি। দেশের ৬৮টি কারাগারে এখন প্রায় ৯৮৭ মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি কনডেম সেলে রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই রয়েছে শতাধিক আসামি। হত্যা-অপহরণ করে লাশ গুম করা,ধর্ষণসহ জঘন্যতম অপরাধে নিম্ন আদালত থেকে তাদের ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী এ সাজা কার্যকর করতে হলে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কোনো আসামি নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকেই এসব মামলার নিষ্পত্তি করতে হয়। নিম্ন আদালত রায় ঘোষণার পর এ-সংক্রান্ত নথিপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়,ওই রায় অনুমোদনের জন্য,যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত।
তবে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার পর আসামিপক্ষই উচ্চ আদালতে আপিল করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। বিষয়টি হাইকোর্টে আসার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ওইসব মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে হাইকোর্ট। এরপর তালিকার ক্রম-অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স শুনানির ক্ষমতাপ্রাপ্ত বেঞ্চে পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।
বিচারিক আদালত থেকে কাউকে ফাঁসি দেওয়ার পর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক হাইকোর্ট থেকে সেই দণ্ড অনুমোদন করতে হয়। হাইকোর্ট থেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখলে আসামিকে ফাঁসি দেওয়া যাবে। আর যদি দণ্ড মওকুফ কিংবা কমিয়ে দেওয়া হয়,সেক্ষেত্রে কমানো রায়টি বাস্তবায়ন করতে হবে। সাধারণত বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্টে একটি হত্যা মামলার রায় হতে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। বিচার কার্যক্রমের ত্রুটি কিংবা আইনজীবীর নথিপত্র দাখিলে কোনো বিচ্যুতির কারণে নিম্ন আদালত থেকে ফাঁসি হওয়ার পর হাইকোর্ট থেকে খালাস পায় অনেক আসামি। আর সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে ১০-১৫ বছর বিনা দোষে জেল খাটতে হয়। ফাঁসির জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় কারাগারের কনডেম সেলে থাকতে হয় ৫-৭ বছর।
উচ্চ আদালত সূত্রে জানা যায়,মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পেপারবুক উচ্চ আদালতেই তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এজন্য জাপান থেকে তিনটি ডিজিটাল ডুপ্লিকেটিং মেশিন ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান,‘ডেথ রেফারেন্সের মামলা শুনানির জন্য উদ্যেগ নেয়া হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। তবে রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান,‘এই মামলাগুলোর দুই পক্ষের নানা আপত্তির কারনে শুনানি হচ্ছে না। আর মামলার পেপার বুক তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়াই উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের মামলার চাপ বাড়ছে।’

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড.মিজানুর রহমান জানান, ‘ডেথ রেফারেন্স মামলার নিস্পত্তি না হওয়ায় মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর ফাঁসির আসামীদের কারাগারে অপেক্ষার প্রহর গোনা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।’

এদের অনেকেই আট থেকে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কনডেম সেলে আটক রয়েছে। বর্তমানে হাইকোর্টে ৪০৭ টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি অপেক্ষায় রয়েছে।

মামলার পেপারবুক তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতা,পর্যাপ্তসংখ্যক বেঞ্চের অভাবে বিলম্বে শুনানি হওয়া,সরকার ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের উদাসীনতাই এর প্রধান কারণ বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুপ্রিমকোর্টের দেয়া তথ্যানুযায়ী,স্বাধীনতার পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিগত ৪২ বছরে ৪৩০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে এখনো মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কারাগারের কনডেম সেলে দুঃসহ দিনযাপন করছে ৯৮৭ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

এদের মধ্যে অনেকেই আট থেকে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কনডেম সেলে আটক রয়েছে। ২০০৫ সালে ফাঁসির দণ্ড দেয়ার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির অপেক্ষায় কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গুণছে চাঞ্চল্যকর আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় আটক ১৮ জন আসামী।

সর্বশেষ তথ্যনুযায়ী, গত দশবছর পর্যন্ত হাইকোর্টে ৯৮৭ টি ডেথ রেফারেন্স আসলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৪০ টি। বর্তমানে হাইকোর্টে ৪০৭ টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এর মধ্যে ২০০৫ সালে হাইকোর্টে আসা ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ১টি,২০০৮ সালের ৯৬ টি,২০০৯ সালের ৭৫ টি,২০১০ সালের ৭৪টি,২০১১ সালের ৬৬ টি,২০১২ সালের ৬০ টি ও ২০১৩ সালে ১১১ ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া ৩৫ টি ডেথ রেফারেন্স এখন পর্যন্ত শুনানি হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন,প্রতি বছর উচ্চ আদালতে যে হারে ডেথ রেফারেন্স মামলা আসে। সে তুলনায় নিষ্পত্তি হয় অনেক কম।

বিগত ১৩ বছরের ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির চিত্র থেকে দেখা যায়,২০০০ সালে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্সের তালিকায় যোগ হয় ৪৪টি নতুন মামলা। কিন্তু ওই বছর সর্বসাকুল্যে নিষ্পত্তি হয় ৪১টি মামলা। ২০০১ সালে ৫৩টি নতুন ডেথ রেফারেন্স মামলা আসে,মোট নিষ্পত্তি হয় মাত্র তিনটি। ২০০২ সালে ৬৪টি,নিষ্পত্তি হয় ৩৭টি মামলা। ২০০৩ সালে ৬৬টি, নিষ্পত্তি হয় মোট ৪৫টি। ২০০৪ সালে ১৭৬টি, নিষ্পত্তি হয় মোট ১০০টি মামলা। ২০০৫ সালে ১৭৫টি,নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৪৫টি। ২০০৬ সালে ১১২টি। নিষ্পত্তি হয় ৬৪টি। ২০০৭ সালে ১০২টি,নিষ্পত্তি হয় ৪৮টি। ২০০৮ সালে ১৩৭টি,নিষ্পত্তি হয় ১৩২টি। ২০০৯ সালে ৮৩টি,নিষ্পত্তি হয় ৫১টি। ২০১০ সালে ৭৬টি, নিষ্পত্তি হয় ৪১টি মামলা। ২০১১ সালে হাইকোর্টে ৬৭ টি ডেথ রেফারেন্স মামলা আসে, ওই বছর মোট ৬৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। ২০১২সালে মামলা আসে ৬০ টি নিষ্পত্তি হয় মোট ১৪৬টি।

সুপ্রিমকোর্টের দেয়া তথ্যানুযায়ী,২০০৮ সালে হাইকোর্টে আসা ১৩৭ টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪১ টি,২০০৯ সালে আসা ৮৩ টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৮টি,২০১০ সালে আসা ৭৬ টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২টি,২০১১ সালে আসা ৬৭ টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১টি। এছাড়া ২০১২ সালের ৬০ টি, ২০১৩ সালে ১১১ ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়েছে।

বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান,সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন,শহীদুল ইসলাম ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে চারটি বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে কাজ করলেও বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবীরা।

সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানান,‘দেশের উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স মামলার এ জট সৃষ্টির পেছনে মামলা নিষ্পত্তিতে কমসংখ্যক বেঞ্চ থাকা এবং পেপার বুক তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেন। এজন্য একজন আসামীর ফাঁসি হওয়ার পরে তাকে দীর্ঘদিন কনডেম সেলে থাকতে হয়।’

কারণ,হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের শুনানিতে অনেক বিলম্ব হয়। অনেক সময় হাইকোর্টে শুনানি হওয়ার পর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা খালাস পান আবার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবনও দেয়া হয়।

এ প্রেক্ষিতে সরকার আপিল বিভাগে আপিল করে। আপিল করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। আবার আপিল মঞ্জুর হলে আপিলের নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। আসামীকে ৮ থেকে ১০ বছর হয়তো কনডেম সেলে থাকতে হয়েছে। এর চেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর হতে পারে না।

এ ধরণের বিলকে দুর্ভাগ্যজনক, সংবিধান ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টে ডেথরেফারেন্স মামলার শুনানি বিলম্ব হওয়ার প্রধান কারণ সময় মতো পেপার বুক তৈরি না হওয়া। পেপারবুক তৈরির জন্যে বিজি প্রেসের ওপর নির্ভর করতে হয়। হাইকোর্টের নিজস্থ কোন প্রেস নেই। হাইকোর্টের নিউজ প্রেস অথবা বিজি প্রেসে পেপারবুক তৈরির জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা দরকার। এছাড়া আপিল বিভাগে দু’টি বেঞ্চ গঠনেরও দাবি জানান তিনি।

সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের জানান, ‘যোগ্যতা সম্পন্ন বিচারপতিদের দিয়ে ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’

অন্যান্য মামলা থেকে ফাঁসির মামলা শুনানির বিষয়টি অগ্রাধিকার কেবল মাত্র কাগজে কলমে নয়, কার্যকরী ভাবেই দিতে হবে। না হলে এ জট কখনোই শেষ হবেনা। একই সঙ্গে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কমপক্ষে ১০ টি বেঞ্চ গঠনের দাবি জানান তিনি।

তবে সম্প্রতি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্টার এ কে এম শামসুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বর্তমানে চারটি বেঞ্চ এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করছে। কিছু অপ্রতুলতার কারণে মামলার জট বাড়ছে। তবে নজরদারি ও গুরুত্ব আরোপের ফলে বর্তমানে ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে গতি ও নিষ্পত্তি বেড়েছে।

রেজিস্ট্রারের দফতর থেকে জানা যায়, ‘পিলখানায় বিডিয়ার হত্যা মামলার রায়ের পর দেশের ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুদণ্ডের এবং ডেথ রেফারেন্সের আপিলের পেপারবুক প্রস্তুত করার জন্য বিশেষভাবে ডিজিটাল ডুপ্লিকেটিং মেশিনগুলো কেনা হয়েছে’ জাপান থেকে আমদানিকৃত নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ডুপ্লিকেটিং মেশিনে পেপারবুক তৈরি হলে তুলনামূলক অনেক কম সময় লাগবে।
তিনি আরও জানান, পিলখানা হত্যা মামলায় ১৩৮ জনের ডেথ রেফারেন্স ও বাকি আসামিদের ক্রিমিনাল আপিলের পেপারবুক সব মিলিয়ে প্রায় ৭-৮ লাখ পৃষ্ঠার মত হতে পারে। আমদানিকৃত ডুপ্লিকেটিং মেশিনে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার পৃষ্ঠা ফটোকপি করা যাবে। তাই স্বাভাবিকের চেয়ে কম সময়ে পেপারবুক তৈরি করে ফটোকপির পর তা প্রস্তুত করে শুনানি শুরু হবে।
ঢাকা, কেএ, ২৪ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ