বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আইনজীবী হিসেবে (এনরোলমেন্ট পরীক্ষা) তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ হতে দূরে রেখেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া এলএলবি/এলএলএম ডিগ্রি মানসম্মত নয়।
এমনকি তাদের সার্টিফিকেট নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। তবে এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। মৌখিক আদেশের মাধ্যমেই এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।
দেশে মোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৭৮টি। এর মধ্যে ৩৩টিতে আইন বিভাগ চালু আছে।
বার কাউন্সিলের অভিযোগ,এই ৩৩টির মধ্যে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এলএলবি/এলএলএম ডিগ্রি মানসম্মত নয় এবং তাদের সার্টিফিকেট নিয়েও রয়েছে জটিলতা। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়,পড়াশোনা না করলেও চলে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো-দারুল ইহসান, প্রাইম, নর্দান, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, আমেরিকা বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর ও ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালগুলোর 'অপকর্মে'র কারণে বার কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে বলেছিল,দেশের যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এলএলবি/এলএলএম ডিগ্রি নিয়েছেন,তাদের তালিকা পাঠাতে। কিন্তু ইউজিসি এ তালিকা পাঠাতে অস্বীকার করেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ‘অ্যাডভোকেটশিপ’ পরীক্ষায় অংশ নেয়া থেকে দূরে রাখছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।
এদিকে ওই ৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এই সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে না-এমন খবরে শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন।
একান্ত সাক্ষাৎকারে বার কাউন্সিলের সচিব মো. আলতাফ হোসেন টাইমনিউজবিডিকে জানান,কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগিরই একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। এতেই বলা থাকবে কারা,কীভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে অথবা পারবে না। ‘গণবিজ্ঞপ্তি’তে কী থাকছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,বার কাউন্সিলের তথ্য কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলতে পারবেন। এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হয়নি।
বার কাউন্সিলের তথ্য কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন জানান,প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়,বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ-বাণিজ্য চলছে। একজন শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়াশোনা করে এলএলবি ডিগ্রি পাবেন,অন্যদিকে আরেকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা না করেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই ডিগ্রি পাবেন-এটা কী ঠিক? এজন্য কাউন্সিল থেকে ইউজিসিকে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছিল দেশের যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে,তাদের তালিকা যাচাই করে পাঠাতে। কিন্তু ইউজিসি তা করেনি। ফলে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে মৌখিকভাবে বারণ করা হয়েছে।
এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে-জানতে চাইলে তিনি বলেন,গণবিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি জারি হলেই বোঝা যাবে পরীক্ষায় কীভাবে অংশ নেয়া যাবে। গণবিজ্ঞপ্তিতে লেখা থাকবে— যে সব শিক্ষার্থী আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে, তাদের তালিকা স্ব স্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বার কাউন্সিলে পাঠাবে। তারপর বার কাউন্সিল তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে বার কাউন্সিলের এমন সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী। তিনি বলেন,‘আমার মনে হচ্ছে কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবু ইউজিসির কোনো করণীয় থাকলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তা করা হবে।
বার কাউন্সিল বলছে-এ বিষয়ে ইউজিসিকে চিঠি পাঠানো হলেও জবাব দেয়া হচ্ছে না-এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আদৌ চিঠি পাঠিয়েছিল কি না,তা আমি জানি না। আমি এটির বিষয়ে খোঁজ নেব।’
অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন,সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমস্যা নেই, ৪-৫টিতে কিছু সমস্যা রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়া দুর্ভাগ্যজনক। কারণ যারা যোগ্য তারাই তো পরীক্ষায় পাস করবে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি ইউজিসি বার কাউন্সিলে চিঠি পাঠিয়ে বলেছে,বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রামে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিলে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় নিবন্ধনের ব্যাপারে মঞ্জুরি কমিশন থেকে তালিকা পাঠানো সম্ভব নয়। এ ছাড়া উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা কমিশনের পক্ষে যাচাই করাও সম্ভব নয়। কারণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা, ট্রান্সক্রিপ্ট সার্টিফিকেট ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের আওতায় আছে।
একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে,‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি নিয়েই প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। আমরা তা দেখেই ভর্তি হয়েছি। চার বছর অনার্স করার পর এখন কেন আইনজীবী হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বুঝতে পারছি না।’
বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী ভূমিকা রয়েছে জানতে চাইলে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একরামুল হক চৌধুরী জানান, ‘কোন কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হচ্ছে না,তা আমাদের জানানো হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো প্রকার নোটিশও দেয়া হয়নি। অথচ 'তারা এখন এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে দিচ্ছে না।’
ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. সামছুল আলম বলেন, ‘বার কাউন্সিলের চিঠির জবাবে আমরা বলেছি,আমাদের পক্ষে এত ছাত্রছাত্রীর তালিকা দেয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন,‘বার কাউন্সিলে শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানো কমিশনের দায়িত্ব নয়। এ ছাড়া কমিশনের পক্ষে এত শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরি করাও সম্ভব নয়।’
বার কাউন্সিল কমিশনের তালিকা ছাড়া এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে দেবে না,আর কমিশনের পক্ষে তালিকা দেয়া সম্ভব নয়,এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘আশা করি বার কাউন্সিল বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জীবনের কথা চিন্তা করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’
[b]ঢাকা,কেএ, ২১ মে (টাইম নিউজবিডি.কম) // জেএ// এসএইচ[/b]
অপরাধ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি'র সার্টিফিকেট জটিলতা!
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আইনজীবী হিসেবে (এনরোলমেন্ট পরীক্ষা) তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ হতে দূরে রেখেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।





