রাজধানীর কল্যাণপুরে গতকাল মঙ্গলবার ‘জঙ্গি আস্তানা’য় পুলিশের অভিযানে নিহত ৯ ‘জঙ্গি’র মধ্যে একজন চট্টগ্রামের এক আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে বলে জানা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের ছবি প্রকাশের পর তা দেখে ছেলেকে শনাক্ত করেন ওই নেতার পরিবারের সদস্যরা।
ওই আওয়ামী লীগ নেতার নাম আজিজুল হক চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুংছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কর্মরত আছেন।
এদিকে, প্রকাশিত ৯ জনের মধ্যে আজিজুল হক চৌধুরীর ছেলে সাব্বিরুল হক কনিককে শনাক্ত করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ছবির তৃতীয় সারির মাঝখানের ব্যক্তিকেই সাব্বির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
খবর পেয়েই গতকাল গভীররাতে আনোয়ারা থানার ওসি আবদুল লতিফ বরুমচড়ায় সাব্বিরদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। তবে সাব্বিরের পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের ভাড়া বাসায় থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তার পিতা-মাতার সাথে কথা বলতে পারেননি ওসি।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, 'নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে সাব্বির নামে একজনের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বলে তথ্য পেয়েছি। তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। তার প্রোফাইল তৈরির কাজ চলছে, এটি শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।'
এদিকে সাব্বিরুল হক কণিক ওরফে সাব্বিরের পরিবার নগরীর বাকলিয়া থানার রাহাত্তারপুলের বাসায় গতকাল রাত থেকে কান্নার রোল পড়েছে। গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশের পর এর মধ্যে গত চারমাস আগে নিখোঁজ তাদের সন্তান সাব্বিরুলও রয়েছে বলে তার পরিবার নিশ্চিত হয়েছেন। তার বাবা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুল হক চৌধুরী পরিবার নিয়ে পুলিশের ভয়ে তার চাচাতো ভাইয়ের বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোডের বাসায় রাত কাটিয়েছেন। সেখানে সবাই বুক চেপে কান্না করছেন আর কেন তাদের সন্তান জঙ্গি হলো সেটির কারণ নিয়ে আলোচনা করছেন।
সাব্বিরের পরিবারের ঘণিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, নিজের ছেলে বিপথগামী হয়েছে এ খবর পেয়েও আইনি ঝামেলা এড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মানের ভয়ে থানায় জিডি পর্যন্ত করেননি আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুল হক চৌধুরী। এখন নিজের ছেলের লাশ নিহত জঙ্গিদের দলে দেখেও চাপা কান্না আসলেও কাউকে কিছুই বলতে পারছেন না তিনি। এমনকি পুলিশি হয়রানি এড়াতে রীতিমত তাকে আত্মগোপনেই থাকতে হচ্ছে। তবে সাব্বিরুলের মা এখনো বিশ্বাস করতে চাইছেন না নিহতদের মধ্যে তার ছেলে আছে।
সাব্বিরুলেন বাবা আজিজুল হক সপরিবারে চট্টগ্রাম শহরের রাহাত্তার পুল এলাকায় বাস করেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। তার বড় ভাই মোজাম্মেল হক চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা পারিবারিকভাবেই আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

সর্বশেষ চার মাস আগে রাউজানে এক বিয়েতে যাওয়ার কথা বলে বাবার কাছ থেকে পাঁচশ টাকা নিয়ে বের হন। সেই থেকে কণিক নিখোঁজ। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না থাকায় সন্তানের আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা। সন্তান নিজে বিপথগামী হয়েছেন বুঝতে পেরে নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি করারও প্রয়োজন মনে করেননি তারা।
সম্প্রতি ‘আইডি নাম্বার দুই’ নামে ফেইসবুকের একটি ভুয়া আইডি থেকে তার কিছু তৎপরতা স্বজনদের কাছে ধরা পড়ে। ওই আইডি থেকে জানান, তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্ত কোথায় আছেন, কেমন আছেন কিছুই বলেননি।
২০০৮ সালে ‘আমাগো সাব্বির দা’ নামে একটি ফেইসবুক আইডি খোলে ব্যবহার করে। গত দু’বছর ধরে সেটি ইনএকটিভ করে রাখে। সম্প্রতি ‘আইডি নাম্বার দুই’ থেকে তার তৎপরতা দেখা যায়। এই আইডিটি ছিল কোরআন-হাদিসের আলোকে নানা স্ট্যাটাসে ভরা। সর্বশেষ এটির ব্যবহার হয়েছিল ২০১৪ সালে। এই আইডিতে অস্ত্র তাক করা এক জঙ্গির ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। আছে পোশাকধারী কিছু মানুষের লাশ বহন করা এবং উটের দৌড়ের ছবি।
এদিকে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাব্বির গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন। রাউজানে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। তবে তাঁর নিখোঁজের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়নি।
এলাকাবাসীর ধারণা, পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁদের সন্তান কোন পথে গেছে। এ জন্য পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে তাঁরা আইনি কোনো ব্যবস্থাও নেননি।
সাব্বিরুল হক কনিক চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারের আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০১০ সালে সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর পর ২০১২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।
এমবিএইচ/কেবি





