মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ হতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে।

বুধবার বেলা সোয়া ১২ টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যর ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধে মতিউর নিজামীর বিরুদ্ধে ৮ অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুটি সুপরিয়র রেসপন্সিবিলিটি স্পস্ট বলে উল্লেখ করেছে ট্রাইব্যুনাল।

নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগের মধ্যে যে ৮টি প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ১, ২, ৩, ৪,৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ।

এর মধ্যে ২, ৪, ৬, ১৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে নিজামীর যবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— একাত্তরের ৩ আগস্ট নিজামী চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে শহর ছাত্রসংঘের এক সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি সেখানে পাকিস্তান রক্ষার পক্ষে বক্তব্য দেন। ওই সভায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি আবু তাহের হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার আদেশ দেন। নিজামী ওই সভায় উপস্থিত থেকেও আবু তাহেরের বক্তব্যের বিরোধিতা না করে মৌন সম্মতি দেন।

২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— একই বছরের ২২ আগস্ট নিজামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল-মাদানি স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি এ সভায় দলীয় নেতাকর্মীদের স্বাধীনতাকামীদের নিশ্চিহ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করেন। এরপর তারা সারাদেশে সংগঠিত হয়ে অপরাধ করতে থাকেন। যার দায় নিজামীর।

৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসমাবেশে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন নিজামী।

৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— একই বছরের ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর যশোর বিডি হলে ছাত্রসংঘের সভায় তিনি জিহাদের সমর্থনে বক্তব্য দেন। নিজামী ওই সভায় বক্তব্য দিয়ে নিরীহ স্বাধীনতাকামী বাঙালি হত্যার নির্দেশ দেন।

৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— নিজামীর নির্দেশে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতায় একই বছরের ৮ মে পাবনার সাঁথিয়া থানার করমজা গ্রামে লোক জড়ো করে নির্বিচারে সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অসংখ্য লোককে হত্যা করা হয়। নারীদের ধর্ষণ করা হয়।

৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে—একই বছরের ২৭ ও ২৮ নভেম্বর পাবনার সাঁথিয়া থানার ধোলাউড়ি গ্রামে ডা. আবদুল আওয়ালের বাড়ি ও আশপাশের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে চারজনকে ধরে নিয়ে ইছামতি নদীর পাড়ে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। সেখানে শাহজাহান আলী নামে একজনকে গলা কেটে ফেলে রাখা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে—ঈশ্বরদি থানার আটপাড়া ও বুথেরগাড়ি গ্রামে ১৬ এপ্রিল হামলা চালিয়ে ১৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে— আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজামী একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঊষালগ্নে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়।

এর আগে চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বুধবার সকাল ১১টা ৮ মিনিটে এ রায় পাঠ শুরু করেন। ২০৪ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায়ের প্রথমাংশ পাঠ করেন বিচারপতি আনোয়ারুল হক। এরপর সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন রায়ের পর্যবেক্ষণগুলো পাঠ শুরু করেন। এরপর মূল রায় পাঠ করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম রায় নিয়ে বিলম্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গের ভূমিকায় বলেন, আমরা আইনের বাইরে টক শো বা রাস্তায় রায় নিয়ে কথা বলতে পারি না। আমরা আইন, ঘটনা ও সংবিধান ছাড়া কারও সাথে আপোষ করি না।

এর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মতিউর রহমান নিজামীকে বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন-চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, মোখলেজুর রহমান বাদলসহ রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন আইনজীবী এবং নিজামীর আইনজীবী তাজুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ খান, রেজাউল কবির, সাইফুর রহমানসহ আসামিপক্ষের ৮-১০ জন আইনজীবী।

নিজামীর স্বজনদের মধ্যে তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন উপস্থিত ছিলেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার দশম রায় এটি। আগের নয়টি মামলায় জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান আটজন এবং বিএনপির দুই নেতাকে দণ্ডাদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে গত ২৪ জুন অসুস্থতার কারণে নিজামীকে আদালতে হাজির না করায় রায় ঘোষণা করেনি ট্রাইব্যুনাল।

গত ২৪ মার্চ নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার বিচার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে মামলাটি যে কোনো দিন রায় (সিএভি) ঘোষণার জন্য রাখে ট্রাইব্যুনাল। নিজামীর মামলাটি একমাত্র মামলা যেটি তিনবার রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছে।

নিজামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি। সেগুলো হচ্ছে :

০৫. একই বছরের ১৪ মে নিজামীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদররা পাবনার ডেমরা ও বাউসগাতি গ্রাম ঘেরাও করে। এরপর সাড়ে চার শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোককে এক জায়গায় জড়ো করে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। সেখানে নারীদের ধর্ষণও করা হয়।

০৯. ১০ জুন আতাইকুলা থানার মাতপুর গ্রামের মাওলানা কছিমউদ্দিনকে ধরে নিয়ে ইছামতি নদীর পাড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়।

১০. ৯ আগস্ট পাবনা শহরের নূরপুর ওয়াপদা মোড় থেকে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মাজেদসহ দু’জনকে ধরে নিয়ে হত্যার পর পাবনা সুগার মিলের পাশে লাশ ফেলে রাখা হয়।

১১. ৩ ডিসেম্বর বেড়া থানার বিছাখালী গ্রামে হামলা চালিয়ে ৭০ জনকে হত্যা করা হয়।

১২. আগস্টের কোনো এক সময় সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

১৩. ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মে মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা ক্যাম্প স্থাপনের পর সেখানে গোলাম আযম ও নিজামী নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করতেন। তারই ফসল হিসেবে সারাদেশে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

১৪. ৩০ আগস্ট রাতে পুরনো এমপি হোস্টেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্পে বন্দি জালাল, রুমী, বদিসহ বেশ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন মতিউর রহমান নিজামী। এরপর তাদের হত্যা করা হয়।

১৫. একই বছরের ৫ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্পে মাঝে মধ্যে নিজামী যেতেন। সেখানে তিনি রাজাকার কমান্ডার সামাদ মিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য শলাপরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হবার কারণে চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান আসামী মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন বর্তমানে হাইকোর্টে ডের্থ রেফারেন্স বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় আছে মামলাটি।

কেএ, জেএ