বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা দুই দুর্নীতি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৩ অক্টোবর।

আজ (সোমবার) সাক্ষ্যগ্রহণ পেছাতে খালেদা জিয়ার ৬টি আবেদন নামঞ্জুর করেন আদালত। এরপর শুরু হয় মামলা দু’টির প্রথম সাক্ষী বাদী দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদের সাক্ষ্যগ্রহণ।

রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজের অস্থায়ী আদালতে খালেদাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। আদালতের বিচারক বাসুদের রায় সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।

দুদক কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ আগামী ১৩ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। ওইদিন বেগম খালেদা জিয়াসহ অভিযুক্তদের আদালতে হাজির হবারও নির্দেশ দেন আদালত।

এর আগে আজ (সোমবার) সকালে আদালতে হাজির না হয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ পেছাতে ফের সময়ের আবেদন জানান মামলা দু’টির প্রধান আসামি খালেদা জিয়া।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর খালেদার আইনজীবীদের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন সপ্তমবারের মতো পিছিয়ে সোমবার পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন আদালত। এদিন খালেদা জিয়াসহ সকল আসামিকে হাজিরের নির্দেশ দিয়ে আদালত জানিয়েছিলেন, সকলের উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া জানান, সারাদেশে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আদালত বর্জন এবং ২০ দলীয় জোটের হরতাল কর্মসূচি থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে আদালতে হাজির ছিলেন না খালেদা জিয়া। আমরা সাক্ষ্যগ্রহণ পেছাতে সময়ের আবেদন জানিয়েছিলাম।

তিনি জানান, দু’টি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পেছাতে দু’টি এবং নিরাপত্তার কারণে খালেদার অনুপস্থিতির জন্য একটিসহ মোট তিনটি আবেদন জানান তারা।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর সাবেক একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান জামিনে আছেন। হারিছ চৌধুরী মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার অপর আসামি হচ্ছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামি মনিরুল ইসলাম ও ড. জিয়াউল ইসলাম হাজির হয়েছেন। মামলার অপর আসামি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে তার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতে হাজিরা দেন।

এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার কার্যক্রম ও মামলার বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে করা চারটি আপিল চলায় আসামিপক্ষের আবেদনে বিচারিক আদালত সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ৬ বার পিছিয়ে দিয়েছিলেন। সর্বশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়া আদালতে না আসায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর সপ্তম দফায় সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে সোমবার পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

অন্যদিকে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বিচার শুরুর আগেও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৪১ বার ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১১ বার চার্জ শুনানির জন্য আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নেন খালেদা জিয়া।

আপিল বিভাগ খালেদার দু’টি আপিল খারিজ করে দিয়েছেন এবং বাকি দু’টি শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ। তবে সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়ে বিচারিক মামলা দু’টি চলতে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট

২০১১ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি।

জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ খান।

২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান। পরের বছরের ১৭ জানুয়ারি খালেদা জিয়া ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে জামিননামা দাখিল করেন।

মামলায় অভিযুক্ত অপর তিন আসামি হলেন- খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান জামিনে আছেন। হারিছ চৌধুরী মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে এ মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার অপর আসামিরা হলেন- বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

তারেক রহমান দেশের বাইরে আছেন। মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ জামিনে আছেন। তবে শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতে হাজির না থাকায় গত ১৯ মার্চ তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

অপর দুই আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

মামলাটি তদন্ত করে দুদকের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ অপর চারজনকে অভিযুক্ত করে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

গত ৭ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত বিশেষ মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের টাকা আত্মসাৎ সংক্রান্ত বিশেষ মামলার বিচারিক কার্যক্রম ঢাকার মেট্রোপলিটন দায়রা জজ-আদালত ভবনের পরিবর্তে ঢাকা মহানগরের বকসিবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন মাঠে নির্মিত অস্থায়ী আদালতভবনে চালানোর আদেশ জারি করে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৯(২) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ওই দুই মামলা পরিচালনার জন্য ভবনটিকে (যা বিডিআর হত্যাকাণ্ড মামলার অস্থায়ী আদালত ছিল) অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি