দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। অস্ত্র আটক মামলায় ২৫৪ ও চোরাচালান মামলায় ২৬০ পৃষ্ঠা করে মোট ৫১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ কর হলো।
চট্টগ্রামের একটি বিশেষ আদালতের দেয়া এই রায়ে আট পৃষ্ঠা করে মোট ১৬ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ রয়েছে। পর্যবেক্ষণের শুরুতে আদালত বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে শক্তিশালী করতে দশ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
বাংলাদেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা এতে সহযোগিতা করেছিলেন। বিষয়টিতে আদালত বিস্মিত হয়েছেন।
মঙ্গলবার রায় প্রদানকারী চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1391501962.jpg[/img]
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো.ওমর ফুয়াদ বলেন, মহামান্য আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ের নথিতে স্বাক্ষর করেছেন। এখন পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় চোরাচালান (বিশেষ ক্ষমতা আইনে) ও অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলার রায় দেন বিচারক।
চোরাচালান মামলার রায়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদন্ড দেন আদালত। একই রায়ে তাদের পাঁচ লক্ষ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1391502080.jpg[/img]
একই ঘটনায় অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় আসামীদের ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৯ (সি) ও ১৯ (এফ) ধারায় সাত বছর কারাদন্ড দেন বিচারক। উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে বলে বিচারক আদেশে উল্লেখ করেন। রায় ঘোষণার আগে আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ের সারসংক্ষেপও উপস্থাপন করেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠের শুরুতে বিচারক বলেন, আজ যে মামলার রায় দিতে এসেছি সেই মামলার সময় আর তিন মাস হলে ১০ বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে এ মামলার রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছি। এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে উভয়পক্ষের কাছে থেকে আমি যথেষ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। এটা একটা ট্রায়াল কোর্ট। সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাক্ষ্যপ্রমাণের বাইরে যাবার সুযোগ আমার নেই।
পরেশ-অনুপের সঙ্গে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সম্পর্ক ছিল রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক বলেন, এ মামলা খুবই বড় মামলা। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংস্থা জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা এ মামলায় আসামী হিসেবে আছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে, জবানবন্দিতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে কথা বলেছেন। তাতে বুঝা গেছে, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া ও অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিল। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1391502206.jpg[/img]
বিচারক বলেন, এনএসআইর মত একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজি একই ফ্লাইটে করে পরেশ ও অনুপের সঙ্গে দুবাই গেছেন, এটা অপর একজন পরিচালক নিজে দেখেছেন, একথা সাক্ষ্যে ছিল। পরেশ বড়ুয়া ও অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সময় মিটিং হত। বিচারক বলেন, এনএসআইর আরেক কর্মকর্তা লিয়াকতের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হত। মেজর লিয়াকত অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় গুরুত্বপূূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। সেসময় এদেশে থাকা অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদীর সঙ্গে লিয়াকতের সম্পর্ক ছিল। লিয়াকত আবুল হোসেন পরিচয়ে ঘটনাস্থলে ছিলেন। পুলিশ সেখানে গেলে তাদের বাধা দেন। লিয়াকত পুলিশকে বলেন, সরকারের পূর্বানুমতি নিয়েই এটা করা হচ্ছে, সরকার এটা জানে, বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী নীরবতা পালন করেন এমন তথ্য দিয়ে রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক বলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর ডিজি সাদিক হাসান রুমি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন। ডিজিএফআই সবসময় প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। অস্ত্র আটকের বিষয়টি রুমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানালে তিনি নীরবতা পালন করেন। পরে তিনি একটি তদন্ত কমিটি করবেন বলে জানান। সাদিক হাসান রুমি সাক্ষ্য দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ে তা এসেছে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি করে সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটিতে ৫ জনের মধ্যে একজন ডিজিএফআইর ডিরেক্টর ছিলেন যিনি পরে মামলার আসামী হয়েছেন। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা সাক্ষী ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ওমর ফারুক, ফররুখ আহমেদ, শামসুল ইসলামের মত কর্মকর্তারা এখানে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বিসিআইসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামানের মত প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য আছেন যিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন। অনেক সাক্ষী উচ্চপদে আসীন ছিলেন। সরকারে থাকা অনেকে আমার এখানে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক উল্লেখ করেন, সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে তার সচিব, তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড.শোয়েব আহমেদ সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইমামুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন, বিসিআইসি শিল্পমন্ত্রী নিজামীর অধীনে ছিল। বিসিআইসি এবং সিইউএফএল জেটিঘাট নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা জিজ্ঞাসাবাদে নিজামী নিজেই স্বীকার করেছেন। এসব বিষয় জাজমেন্টে এসেছে। বাবর পাঁচজনকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক উল্লেখ করেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার নির্দেশে ঘটনাস্থলে থেকে পাঁচজন লোককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আবার অস্ত্র আটকের পর বাবর চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এখানে পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেছিলেন, এটা একটা সেনসেটিভ মামলা। তোমরা কেউ মুখ খুলবেনা।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1391502408.jpg[/img]
রাজনৈতিক হয়রানির প্রমাণ মেলেনি রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তিনজন লোককে চিহ্নিত করেছিল। মতিউর রহমান নিজামী ও লুৎফুজ্জামান বাবর বারবার অভিযোগ করেছেন, তাদের রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কিন্তু সাক্ষীতে আমি তাদের প্রতিপক্ষ দলের সদস্য কাউকে পাইনি। যারা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা সরকারী কর্মকর্তা, সরকারের উচ্চপদে ছিলেন। সামরিক-বেসামরিক, সরকারী কর্মকতা ছাড়া কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি এখানে সাক্ষ্য দেননি। সুতরাং তাদের যুক্তি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।ছোটখাট ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা সম্ভব রায়ের সারসংক্ষেপে বিচারক আরও বলেন, বাংলাদেশে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার মত আর কোন মামলা কখনো হয়নি। বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের মামলা হয়েছে বলে কোন তথ্য আমরা এখনও পাইনি। যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে তা দিয়ে ছোটখাট একটি ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা যেতে পারত।
বিচারক বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ করে কারও প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণের কোন যুক্তি আমি পাইনি। একটি টি অস্ত্র পাওয়া গেলেও আমরা সাজা দিই। কিন্তু এতবড় অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা একই ধারার চিন্তা করা কারও উচিৎ হবেনা।পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ পাঠ করে বিচারক দুটি মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা হলেন, জামায়াতের আমির ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমাণ্ডার পরেশ বড়ুয়া, এনএসআইর সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইর সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, ডিজিএফআইর সাবেক পরিচালক (নিরাপত্তা) অবসরপ্রাপ্ত উইং কমাণ্ডার সাহাবুদ্দিন আহমেদ, এনএসআইর সাবেক উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, রায়ে আদালত এনএসআইর সাবেক মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, রায়ে আদালত সিইউএফএলর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহসিন উদ্দিন তালুকদার, সিইউএফএলর সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, রায়ে আদালত চোরাচালানি হিসেবে অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান, অস্ত্র খালাসের জন্য শ্রমিক সরবরাহকারী দীন মোহাম্মদ ও ট্রলার মালিক হাজী আবদুস সোবহান।
[b]ঢাকা, ৪ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]