কুষ্টিয়ায় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। কুষ্টিয়ায় গত ১৮মাসে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারীরা। যৌতুকের কারনে হত্যা, পারিবারিক বিরোধের জেরধরে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ করে হত্যাসহ বিভিন্ন ভাবে কুষ্টিয়ায় গত ১৫ মাসে ২৮জন নারী হত্যা ও ১১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
সুত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৩ মাসে জেলায় ৩জন নারী খুন হয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার মিরপুরে শেফালী খাতুন (২৫) নামের এক গৃহবধুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় ইয়ারুন নেছা নামের এক ভিক্ষুককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সদর উপজেলার পূর্ব আব্দালপুরের সিতেলীপাড়ায় এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তহুরা খাতুন (৩০) নামে এক গৃহবধুুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

এদিকে, ২০১৪ সালের এক বছরে ২৫ জন নারী হত্যা ও ১১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন শিশু যুবতী এমনকি বৃদ্ধাও। প্রতিহিংসা, লালসা শিকার হয়েছে অনেক নারী ও শিশু।

সুত্র জানায়, ২০১৪ সালের গত ৮ জানুয়ারী কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গৃহবধুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার করে।

গত ২২ জানুয়ারী কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় কল্পনা খাতুন (৩০) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করে তারই পাষন্ড স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজন। গত ২৫ জানুয়ারী কুষ্টিয়ার খোকসায় গাছের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় রুনা আক্তার (১১) নামে এক স্কুল ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গত ৪ ফেব্রুয়ারী কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নাজমা খাতুন (২৫) নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। গত ৮ মার্চ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের মাজিহাট গ্রামে রাহিমা খাতুন (২২) নামের এক গৃহবধুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ২৯ মার্চ কুষ্টিয়ায় অর্পা রানী পাল (৮) নামের এক শিশুকে ধর্ষনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার তেকালা মাঠ থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তহমিনা খাতুন (৩০) নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
গত ২০ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মিরপুরে তামান্না খাতুন তমা (১৪) নামে এক নবম শ্রেনীর স্কুলছাত্রীকে হত্যা করে ঘরের ডাবের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ উঠে। গত ১ মে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নুসরাত জাহান মালা (২০) নামে এক কলেজ ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১০ মে কুষ্টিয়ার হাউজিং এ-ব্লকের ৩৮ নম্বর বাড়িতে জহুরা খাতুন (৫৪) নামে এক গৃহবধুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ১০ মে একইদিন কুষ্টিয়ার খোকসায় সৎ মা কোমলপানীয়র সাথে বিষ খাইয়ে আফসানা খাতুন নামে (১) বছরের এক শিশুকে হত্যা করে। গত ১২ মে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউপির চরবাহির মাদিয়া গ্রামের ধানক্ষেত থেকে রিজিয়া খাতুন নামে (৫০) এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গত ৩ জুন কুষ্টিয়ার মিরপুরে কুমকুমি খাতুন শম্পা (২০) নামে এক নববধুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তার স্বামী। গত ৩ জুন একই দিন কুষ্টিয়ার খোকসায় আফরোজা (২২) নামের ৪ মাসের এক অন্তস্বত্বা গৃহবধূকে গলাটিপে হত্যা করে তার স্বামী।

গত ৫ জুন কুষ্টিয়ায় মোমেনা খাতুন (৩৫) নামে এক দুই সন্তানের জননীকে পিটিয়ে হত্যা করে পাষন্ড স্বামী। গত ১২ জুন কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস ফুলতলায় কানিজ ফাতেমা (২৫) নামে এক গৃহবধুকে হত্যা করা হয়। গত ১৫ জুন কুষ্টিয়ার মিরপুরে স্বামীর নির্যাতনে রোজিনা খাতুন (২৮) নামের এক গৃহবধুর মৃত্যু হয়।

গত ১৯ জুলাই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অজ্ঞাত পরিচয় এক মহিলার (৬০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ২৪ জুলাই কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মশান বলিদাপাড়া গ্রামে রুপালী খাতুন (১৮) নামে এক নববধুকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে যৌতুকের দাবিতে আরজিনা খাতুনকে (২৮) নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পাষন্ড স্বামী।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে যৌতুকের মাত্র ৩০ হাজার টাকা না দেয়ায় মিতা আক্তার (২০) নামে এক গৃবধুকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় ভেড়ামারায় ববিতা খাতুন (১৯) নামে এক নববধূকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে।

গত ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার মিরপুরে মাটি খুড়ে অজ্ঞাত পরিচয়ে (৩০) এক মহিলার লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অজ্ঞাত পরিচয় (৩৫) এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে রুমা খাতুন (৩৫) নামে এক গৃবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

অপরদিকে, কুষ্টিয়ায় ২০১৪সালে ১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। জেলায় হত্যা খুনের পাশাপাশি বছর জুড়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অনেক নারী। ঘরে-বাইরে সব খানেই নিগৃহীত হয়েন নারীরা। প্রতিহিংসা, লালসা ও স্বার্থের বলি হয়েছে নারী ও শিশুরা। কুষ্টিয়ায় গত এক বছরে ধর্ষণের হাত থেকে রেহায় পায়নি শিশু থেকে যুবতী কেউয়িই। নিজের স্বজন এমনকি সমাজের দর্পণ শিক্ষকদ্বারা নিগৃহীত হয়েন নারীরা। নারীদের জন্য আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয় কুষ্টিয়া। ধর্ষণের পর খুনের ঘটনাও ঘটেছে কুষ্টিয়ায়। তবে একের পর এক এসব অপরাধ সংঘটিত হলেও বেশির ভাগিই থেকেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

সুত্র জানায়, ২০১৪ সালের গত ১৮ নভেম্বর কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে ওই বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক। পরে ওই শিক্ষকের আটক করে পুলিশ।
গত ৩০ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ষণের শিকার হয় এক কন্যা শিশু। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, সামিরুল একই এলাকার জনৈক দিন মজুরের কন্যা শিশুকে (৫) ফুঁসলিয়ে পাশের বাঁশ বাগানে নিয়ে তার উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। শিশুটির চিৎকারে লোকজন ছুটে এলে সামিরুল পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে এলাকাবাসী তাকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। গত ২১ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে (১৫) এক কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়।

গত ২৯ মার্চ কুষ্টিয়ায় অর্পা রানী পাল (৮) নামের এক শিশুকে ধর্ষনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত অর্পা রানী শহীদ বীর প্রতীক দিদার কিন্ডার গার্ডেনের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার পল্লীতে (৬) বছর বয়সী এক কন্যা শিশুকে ধর্ষণ করে ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ।
গত ১ জুন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হয়। উপজেলার মরিচা ইউপির বৈরাগীরচর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

গত ২৯ জুন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার চাঁদগ্রাম ইউনিয়নের চন্ডিপুর বাড়াদি পাড়ায় প্রতিবন্ধি শিশু (৯) ধর্ষনের শিকার হয়।

গত ৩ আগস্ট কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নাছিমা খাতুন (২৮) নামে এক গৃহবধূকে ওই পল্লী চিকিৎসক ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষনের ন্যায় বিচার না পেয়ে ওই গৃহবধু গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে।

গত ৯ আগস্ট কুষ্টিয়ায় দৌলতপুরে (১৫) এক কিশোরী মেয়ে ধর্ষনের শিকার হয়।
গত ৯ আগস্ট কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় এক বৃদ্ধ কর্তৃক কিশোরী ধর্ষশের শিকার হয়। ইবি থানার বেড়বাড়াদিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

কুষ্টিয়ার এক মানবাধিকার কর্মী বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয় না। তাই ধর্ষিতাদের বাকি জীবনটা কাটাতে হয় জিন্দা লাশের মতোই।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, সন্ত্রাসী ও অপরাধীর যতই শক্তিশালি হোক না কেন তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

ইআর