সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের নামে বিদেশ থেকে আনা অর্থের কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
কিন্তু তৃতীয় বারের মতো সংস্থাটির এমডি হলেও ঢাকা ওয়াসার নিয়ন্ত্রণাধীন রাজধানীর বেদখল হতে যাওয়া খালগুলোর নিয়ে তার নির্বিকার ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে।
এর আগেও দুই মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার অভিযোগ।
আগের দুই মেয়াদে গত কয়েক বছরে ঢাকা শহরে নতুন কোনো ড্রেনেজ লাইন করা হয়নি, এমনকি লাইনগুলো ঠিকমতো পরিষ্কারও করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহক সেবার চেয়ে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-বাণিজ্য আর ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে বিনিময়ে কমিশন আদায়ে ব্যস্ত থেকেছেন তিনি। এমন অভিযোগ করছেন খোদ ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এদিকে, অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর প্রায় সব এলাকার রাস্তাগুলোতে পানি জমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে এই সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এ সমস্যা নিরসনেও কোনো উদ্যোগ নেই তার। এ ব্যাপারে ওয়াসার এমডি নির্বিকার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতার কারণ হলো খালগুলো বেদখল হয়ে যাওয়া, পুরানো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে যাওয়া, নতুন করে হড়ে ওঠা এলাকা ও ঘরবাড়ি ড্রেনেজের আওতাভুক্ত না করা।
অথচ এ সমস্যা লাঘবে অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে তাকসিম এ খান এ পর্যন্ত অর্ধশতবার বিদেশ সফর করলেও সমস্যার সমাধানের কোনো লক্ষণ প্রতিফলিত হয়নি ড্রেনেজ ব্যবস্থায়।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. রোখসানা হাফিজ বলেন, উন্নত বিশ্বে নিচু ভূমিতে অনেক কল-কারখানা ও আবাসন গড়ে উঠছে। কিন্তু সেখানে কোনো জলাবদ্ধতা নেই। কারণ সেখানে রয়েছে পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম। ভৌগোলিক কারণেই ঢাকা একটু নিচু স্থানে গড়ে উঠেছে।
তাই আধুনিক ড্রেনেজের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া আমাদের শহরে যে পরিমাণ ড্রেন রয়েছে তাও ময়লা-আবর্জনা দিয়ে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। তাই যেকোনো মাত্রার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
তিনি আরো বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পারদর্শী লোকজনের সম্পৃক্ততা না বাড়ালে ভবিষ্যতে ঢাকাবাসীকে আরো ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখামুখি হতে হবে।
অন্যদিকে, বছরের পর বছর ধরে বেদখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারেও ওয়াসার তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এ ব্যাপারেও ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের উদাসীনতাই দায়ী বলে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াসার ড্রেনেজ সার্কেল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, রাজধানীর দু-একটি খালে আমরা অভিযান চালিয়েছি, যা যথেষ্ট নয়। অভিযান চালিয়ে আসার পর তা আবারও দখলে চলে যায়।
অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর খালগুলোর জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বৃষ্টি হওয়ার পর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলে পানি জমে যায়। খালগুলো সচল থাকলে পানি সহজেই সরে যেত।
পরিবেশবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজের অপ্রতুলতা। অনেক এলাকায় ড্রেনেজ সিস্টেম নেই। আবার সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার সুযোগে ড্রেনে নির্বিচারে কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
এ কারণেও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। তাই জলাবদ্ধতা রোধে আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম ও খালগুলো উদ্ধার করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ওয়াসা এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট জ্ঞান ও তৎপরতা রাখে বলে মনে হয় না।
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর খালটি কয়েক বছর আগেও ছিল বেশ বড়সড়। এখন প্রভাবশালী মহলের দখলে এটি একটি ড্রেনের মতো হয়ে গেছে। রূপনগরে ওয়াসার পাম্প সংলগ্ন স্থানে এ খালটি দখল করে বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। খালের মাঝখানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলে খালের অস্তিত্বই বোঝা যায় না।
শুধু রূপনগরই নয়, এমন করুণ হাল এখন রাজধানীর সব খালেরই। এসব জায়গায় ঢাকা ওয়াসা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনার অংশবিশেষ ভেঙে দিলেও আবারো তা পুরানো অবস্থায় ফিরে আসে। ফলে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে চালানো উচ্ছেদ অভিযানের ফলাফল হয় শূন্য।
মূলত এ অভিযান লোক দেখানো। এর মাধ্যমে ঠিকাদারের সঙ্গে সমঝোতা করে অর্থ হাতিয়ে নেয় ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তারা।
ইব্রাহীমপুর খালে গিয়ে দেখা যায়, খালের দুই পাড়েই অবৈধ স্থাপনা তুলে দখল করা হয়েছে। ইব্রাহীমপুর কালভার্ট এলাকায় ঢাকা ওয়াসার পাম্প হাউসের পাশে খালের দক্ষিণ পাড় দখল করে টিনশেড ও আধাপাকা ঘর তোলা হয়েছে। আবার পাশেই আরেক অংশ ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর মোট দুই হাজার ৪৬০ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উন্মুক্ত রয়েছে। তাও আবার ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়েও দেখা গেছে, ড্রেন থাকলেও সেসব ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরা। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো অবস্থা নেই।
রামপুরা থেকে বাড্ডা হয়ে চৌরাস্তা থেকে কুড়িল পর্যন্ত প্রশস্ত ড্রেনটির বেশির ভাগই আবর্জনায় ভরে আছে। ড্রেনের ওপর দিয়ে রড-সিমেন্টের স্লাবও কিছু স্থানে ভেঙে গেছে। ড্রেন দিয়ে পানিপ্রবাহের কোনো সুযোগ নেই। চার-পাঁচ ফুট প্রশস্ত ও পাঁচ-ছয় ফুট গভীর এই ড্রেনের মাধ্যমে কোনো পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।
এদিকে, রাজধানীর আয়তন দিন দিন বাড়লেও সে তুলনায় ড্রেনেজের আওতা বাড়ানো হচ্ছে না। পুরো রাজধানীর ৩০ শতাংশ এলাকা ছাড়া ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ সিস্টেম বাকি এলাকাগুলোতে একেবারেই নেই বললেই চলে। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথাও নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একজন প্রকৌশলী বলেন, তাকসিম এ খান এমডির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কোনো দৈনন্দিন কাজে তার মনোযোগ নেই। শুধু বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে টাকা কামানোই এখন তার মূল কাজে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, রাজধানীতে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার ব্যাপারে ওয়াসা যে পরিমাণ কাজ করে, এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই। এ কাজ শুধু ওয়াসার একার নয়।
ঢাকা ওয়াসা বর্ষার পানি সরানোর ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ এলাকা দেখভাল করে। বাকিটা তাদের আওতার বাইরে বলে তিনি জানান।
ঢাকা, ১৪ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ





