দুষ্কৃতকারীদের হামলার সময় পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনেছেন নিহত ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।
এক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, তার ও তার স্বামীর ওপর হামলার সময় তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাননি।
তার ভাষায়, আমি ও অভিজিৎ যখন নিষ্ঠুর হামলার শিকার হচ্ছিলাম, স্থানীয় পুলিশ আমাদের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারা কিছুই করেনি।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর এনকোয়ারি (সিএফআই) বিবৃতিটি প্রকাশ করে। সেখানে বন্যা লিখেছেন, “আমার স্বামী অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তিনি ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনাও করেছেন।
এর কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার স্ত্রী, সহকর্মী, লেখক ও মুক্তমনা হিসেবে আমি এ ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।”
তিনি বলেন, “ওই হামলা কেবল একজন মানুষের ওপরই ছিল না, ছিল সমগ্র মানবতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর হামলা।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামপাস ঐতিহাসিকভাবেই প্রগতিশীল আন্দোলনের স্থান। অনেকবার হুমকি পেলেও আমরা কল্পনাও করতে পারিনি, এরকম জায়গায় এমন ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।'' তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে খুনিদের ধরে বিচারের আওতায় আনতে সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান জানাই। এখানে লেখকরা নিহত হন, কিন্তু হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হয় না। আমি পুরো বিশ্বের প্রতি আমাদের বিচারের দাবির সঙ্গে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাই।”
এদিকে, হামলার সময়কার স্মৃতি মন থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছিল বন্যার। তবে ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং হামলার সময়ের স্মৃতি আস্তে আস্তে মনে পড়ছে। বিবিসি নিউজআওয়ারকে এসব কথা জানিয়েছেন বন্যা।
তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভবত ওই সময়ে (হামলার আগ মুহুর্তে) পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বাসায় যাচ্ছিলাম। মনে হয় আমি তার (অভিজিৎ) হাত ধরে হাঁটছিলাম।
এরপর থেকে কোনো একটা যানবাহনে তোলার আগের আর কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে রক্তে আমার শরীর ভেসে যাচ্ছিল।’
‘অভিজিৎ তখনও বেঁচেছিল। আমার পাশে একটি স্ট্রেচারে শুয়ে ছিল ও। চিকিৎসরা ছোটাছুটি করছিল। আমি তাদের বলেছিলাম, আগে ওকে দেখুন প্লিজ, আমার অবস্থা ওর চেয়ে ভালো। অভিজিৎ গোঙড়াচ্ছিল। তবে ওর জ্ঞান ছিল না।’
তিনি জানান, হাসপাতালে যাওয়ার পরই তাদের ওপর হামলা চালানোর বিষয়টি বুঝতে পারেন বন্যা। সে সময়ই তার মাথায় আঘাতের বিষয়টি লক্ষ্য করেন। হাতেও মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন বন্যা। তার একটি আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতেই থাকবেন বলেও জানিয়েছেন অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।
বাংলাদেশে মৌলবাদী চেতনা ‘শিকড়ের গভীরে’ পৌঁছেছে বলেও বিবিসির কাছে মন্তব্য করেছেন বন্যা।
অভিজিৎকে একজন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন নাস্তিক হিসেবে উল্লেখ করে বন্যা জানান, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানের প্রচারে জীবন উৎসর্গ করেছে অভিজিৎ।
তিনি বলেন, ‘আমি কথা বলেই যাব। আমরা যা বিশ্বাস করি তার প্রকাশ করতেই থাকবো। এই কারণেই তো অভিজিৎকে মরতে হলো। তবে আমি হাল ছাড়বো না।’
মঙ্গলবার রাতে অভিজিতের বাবা অজয় রায় জানান, অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। বন্যা তার কাছে হত্যাকন্ডের বর্ণনা দেন।
অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে অভিজিতের বাবা অজয় রায় জানান, রাফিদা আহমেদ বন্যার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। বন্যা তার শ্বশুরের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন।
বন্যা বলেন, ‘সাহায্যের জন্য অনেক ডাকাডাকি করলেও সেদিন কেউ এগিয়ে আসেনি। সবাই হা করে তাকিয়ে দেখছিল। রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। তবুও কেউ আসেনি। অবশেষে এক ফটোগ্রাফার এগিয়ে আসেন। তিনি একটি সিএনজি ডেকে আনেন। অভিজিৎকে সেটাতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে অভিজিৎ চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার চিন্তায় আমিও অজ্ঞান হয়ে যাই।’
বন্যা বলেন, ‘সেদিনের দুঃস্মৃতি আজও তাড়া করে। প্রিয়তম স্বামীকে হারানোর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। খুনিদের দেখলে চিনতে পারব। অন্তত একজনকে, যার খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল মুখে। আরো দুজন কাছেই দাঁড়িয়েছিল।’
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে নিহত হন অভিজিৎ। তার স্ত্রী বন্যা আহত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। এরই মধ্যে মামলার তদন্ত করতে গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের কর্মকর্তারা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। হত্যাকাণ্ডের আলামতগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে পরীক্ষার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন আদালত।
এএইচ





