দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণার আগে চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মুজিবুর রহমান মাত্র দুই পৃষ্ঠার সার সংক্ষেপ পড়ে শোনান। সেই সার সংক্ষেপে আদালত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সার সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়, দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা ডিজিএফআই’র তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি জেনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নীরবতা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন বলে রুমিকে জানিয়েছিলেন। সার সংক্ষেপে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার মত আর কোন মামলা কখনো হয়নি।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের মামলা হয়েছে বলে কোনো তথ্য আমরা এখনও পাইনি। যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তা দিয়ে ছোটখাট একটি ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা সম্ভব।
আদালত বলেন, এ মামলা একটি বড় মামলা। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি সংস্থা জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা এ মামলায় আসামি হিসেবে আছেন।
পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা গেছে, জবানবন্দিতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে কথা বলেছেন। তাতে বোঝা গেছে, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া ও অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিল। এনএসআই'র মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজি একই ফ্লাইটে করে পরেশ ও অনুপের সঙ্গে দুবাই গেছেন। এটা অপর একজন পরিচালক নিজে দেখেছেন, একথা সাক্ষ্যে ছিল।
পরেশ বড়ুয়া ও অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সময় মিটিং হত। এনএসআই’র আরেক কর্মকর্তা লিয়াকতের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হত। মেজর লিয়াকত অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় এদেশে থাকা অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদীর সঙ্গে লিয়াকতের সম্পর্ক ছিল। লিয়াকত ঘটনাস্থলে ছিলেন আবুল হোসেন পরিচয়ে। পুলিশ সেখানে গেলে তাদের বাধা দেন। লিয়াকত পুলিশকে বলেন, সরকারের পূর্বানুমতি নিয়েই এটা করা হচ্ছে, সরকার এটা জানে। বিষয়টি সাক্ষ্য প্রমাণে এসেছে।
রায়ের সার সংক্ষেপে বলা হয়, এ মামলায় প্রত্যেকটা সাক্ষী ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ওমর ফারুক, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফররুখ আহমেদ, শামসুল ইসলামসহ অনেকে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) ইমামুজ্জামানের মতো প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য আছেন, যিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন। অনেক সাক্ষী উচ্চপদে আসীন ছিলেন। সরকারে থাকা অনেকে আমার এখানে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইমামুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন, বিসিআইসি তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিজামীর অধীনে ছিল। বিসিআইসি এবং সিইউএফএল জেটিঘাট নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা জিজ্ঞাসাবাদে নিজামী নিজেই স্বীকার করেছেন। এসব বিষয় জাজমেন্টে এসেছে।
রায়ে বলা হয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার নির্দেশে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজন লোককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আবার অস্ত্র আটকের পর বাবর চট্টগ্রামে এসেছিলেন। চট্টগ্রামে পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেছিলেন, এটা একটা সেনসেটিভ মামলা। তোমরা কেউ মুখ খুলবে না।
সবশেষে বিচারক বলেন, এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে উভয়পক্ষের কাছে থেকে যথেষ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। এটা একটা ট্রায়াল কোর্ট। সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাক্ষ্য প্রমাণের বাইরে যাবার সুযোগ আমার নেই।
তিনি বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণ বিচার বিশ্লেষণ করে কারও প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণের কোনো যুক্তি আমি পাইনি। একটি দু’টি অস্ত্র পাওয়া গেলেও আমরা সাজা দেই। কিন্তু এত বড় অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা একই ধারার চিন্তা করা কারও উচিৎ হবে না। এখানে একটু সমস্যা হয়েছে অস্ত্র আইনে এবং চোরাচালানের জন্য স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে দু’টি মামলা হয়েছে। ফলে দু’বার করে সাক্ষ্য লিখতে হয়েছে।
বিচারক আরো বলেন, আইনজীবীরা আপনারা যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, আপনারা একবার লিখেই দায়িত্ব শেষ করতে পেরেছেন। কিন্তু আমাকে প্রত্যেক সাক্ষ্য দু’বার করে লিখতে হয়েছে।
বিচারক বলেন, একটা মামলায় একপক্ষ জিতবে, আরেকপক্ষ হারবে। একপক্ষ খুশি হন, আরেকপক্ষ সংক্ষুব্ধ হন। রায় শুনে কেউ সংক্ষুব্ধ হলেও এখানে কোনো রকম পরিবেশ নষ্ট করবেন না। সংক্ষুব্ধ পক্ষ উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।
[b]ঢাকা, জিই, ৩০ জানুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর
[/b]
অপরাধ
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণার আগে চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মুজিবুর রহমান মাত্র দুই পৃষ্ঠার সার সংক্ষেপ পড়ে শোনান। সেই সার সংক্ষেপে আদালত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।





